কলাম

তেলাপোকা- একটি অপমানসূচক শব্দ। অথচ সেই শব্দকেই পরিচয়ে পরিণত করে ভারতের তরুণেরা তৈরি করেছে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। ঘটনাটি নিছক একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ড নয়; বরং এর ভেতরে লুকিয়ে আছে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ, অপমানবোধ, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অনাস্থা এবং প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে তাদের দূরত্বের গল্প।

সম্প্রতি ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ১৫ মে সুপ্রিম কোর্টের এক শুনানিতে তিনি এমন কিছু তরুণকে ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেন, যারা চাকরি বা পেশায় জায়গা না পেয়ে সাংবাদিক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী কিংবা অধিকারকর্মী হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করেন বলে মন্তব্য করেন।

শব্দটি সেখানেই থেমে থাকেনি। বরং অপমানের ভাষা দ্রুতই প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ‘ককরোচ’ পরিচয় গ্রহণের প্রবণতা। গড়ে ওঠে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। তরুণদের একটি অংশ ব্যঙ্গ, মিম, ভিডিও ও ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করে।

এখানেই ঘটনাটির রাজনৈতিক তাৎপর্য।

অপমান যখন পরিচয়ের শক্তি

ক্ষমতাবানদের দেওয়া অপমানসূচক কোনো শব্দ কখনো কখনো উল্টো প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়। ককরোচ আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছে।

একজন শিক্ষিত তরুণ যখন দীর্ঘদিন পড়াশোনা, পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতার পরও চাকরি পান না, তখন তার হতাশা শুধু অর্থনৈতিক থাকে না। ধীরে ধীরে তা আত্মসম্মান, সামাজিক অবস্থান এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকটে রূপ নেয়।

‘তেলাপোকা’ শব্দটি সেই আহত আত্মমর্যাদাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

জেন-জি প্রজন্মের প্রতিবাদের ধরনও আগের প্রজন্মের চেয়ে আলাদা। তারা সব সময় মিছিল, দীর্ঘ বক্তৃতা কিংবা প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিবাদ করে না। মিম, ব্যঙ্গ, প্যারোডি, ভাইরাল ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষাই অনেক সময় তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার।

ফলে ককরোচ জনতা পার্টিকে প্রচলিত অর্থে রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখলে হয়তো ভুল হবে। বরং এটি একটি সময়ের মনস্তাত্ত্বিক দলিল—যেখানে ব্যক্তিগত হতাশা ডিজিটাল পরিসরে এসে সমষ্টিগত রাজনৈতিক অভিব্যক্তি পেয়েছে।

চাকরির সংকটের সঙ্গে রাজনীতির যোগ

এই ক্ষোভের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা।

ভারতের তরুণদের একটি অংশ এমন একটি প্রতিশ্রুতি নিয়ে বড় হয়েছে, ভালোভাবে পড়াশোনা করলে ভালো চাকরি পাওয়া যাবে, আর চাকরি জীবনকে স্থিতিশীল করবে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে না।

প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ, দীর্ঘ নিয়োগপ্রক্রিয়া, চুক্তিভিত্তিক কাজ, কম বেতন, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং যোগ্যতার তুলনায় সীমিত সুযোগ, সব মিলিয়ে তরুণদের একটি অংশের মধ্যে তৈরি হচ্ছে গভীর হতাশা।

অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় বয়ানে ভারতকে তুলে ধরা হচ্ছে স্টার্টআপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি ও দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশ হিসেবে। কিন্তু একজন চাকরিপ্রার্থীর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা যদি হয় কোচিং সেন্টার, পরীক্ষার অপেক্ষা, অস্থায়ী কাজ কিংবা দীর্ঘ বেকারত্ব—তাহলে রাষ্ট্রীয় সাফল্যের গল্পের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত বাস্তবতার দূরত্ব তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

এই দূরত্বই রাজনৈতিক অসন্তোষের উর্বর জমি।

পুরোনো রাজনৈতিক ভাষা কেন কাজ করছে না

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধীদের মোকাবিলায় পরিচিত কিছু কৌশল ব্যবহৃত হয়েছে—দেশবিরোধী, ষড়যন্ত্রকারী, উগ্রপন্থী কিংবা বিদেশি শক্তির এজেন্ট হিসেবে আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করা।

কিন্তু জেন-জি সেই ভাষার সঙ্গে খুব সহজে খাপ খায় না।

কারণ তারা তথ্য যাচাই করতে পারে, একই ঘটনার একাধিক ভিডিও দেখতে পারে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কোনো দাবি বা সরকারি বক্তব্যের পাল্টা তথ্য হাজির করতে পারে।

তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ও অনেক সময় দলকেন্দ্রিক নয়। তারা কোনো দলের স্থায়ী সমর্থক হওয়ার চেয়ে নির্দিষ্ট ইস্যুতে অবস্থান নিতে বেশি আগ্রহী। ফলে প্রচলিত দলীয় রাজনীতির কাঠামোর বাইরে থেকেও দ্রুত বড় একটি জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করা সম্ভব হচ্ছে।

ককরোচ আন্দোলন সেই পরিবর্তনের একটি প্রতীকী উদাহরণ।

মিম এখন শুধু বিনোদন নয়

জেন-জির রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো আইরনি বা বিদ্রূপ।

একসময় রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ছিল কার্টুন, নাটক কিংবা সংবাদপত্রের কলামের বিষয়। এখন মিম সেই জায়গা দখল করেছে। একটি ছবি, একটি বাক্য কিংবা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও লাখো মানুষের কাছে একই সময়ে পৌঁছে যেতে পারে।

ককরোচ নামটিও এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার পক্ষ থেকে যে শব্দটি অপমান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, তরুণেরা সেটিকে নিজেদের পরিচয়ের অংশ বানিয়ে নিয়েছে।

এটি একধরনের রাজনৈতিক কৌশলও বটে। কারণ অপমানের ভয়কে সরিয়ে দিলে ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র দুর্বল হয়ে যায়।

দক্ষিণ এশিয়ায় একই প্রবণতা

ভারতের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। গত কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্থান দেখা গেছে।

শ্রীলঙ্কার তরুণদের আন্দোলন সরকার পতনের পথ তৈরি করেছিল। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ডেকে আনে। নেপালেও জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ রাজনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

দেশগুলো আলাদা, রাজনৈতিক বাস্তবতাও আলাদা। কিন্তু আন্দোলনগুলোর মধ্যে একটি মিল স্পষ্ট—প্রচলিত রাজনৈতিক দলের বাইরে তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত সংগঠিত হওয়া।

তারা দলীয় পতাকার চেয়ে ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়েছে। নেতৃত্বের চেয়ে সমষ্টিগত অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়েছে। আর মাঠের আন্দোলনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সংগঠনের প্রধান অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহার করেছে।

এটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রচলিত রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

ভোটের পরও নাগরিকের রাজনীতি আছে

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর একটি পুরোনো ধারণা হলো, নির্বাচনে জয়লাভ করলেই জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ মূলত শেষ। এরপর সরকার প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করবে।

ডিজিটাল যুগ এই ধারণাকে বদলে দিয়েছে।

নির্বাচনের পরও জনগণ সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করছে। কোনো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হতে পারে। ফলে পাঁচ বছরের জন্য পাওয়া নির্বাচনী বৈধতা আর সব সিদ্ধান্তের স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন নয়।

বিশেষ করে তরুণেরা এখন সরকারের কাছে শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যান শুনতে চায় না। তারা জানতে চায়- চাকরি কোথায়, শিক্ষাব্যবস্থার মান কী, নিয়োগপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কী এবং তাদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ।

আন্দোলন সফল হলেই কি রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি হয়?

এখানে অবশ্য একটি সতর্কতা জরুরি।

একটি আন্দোলন সরকারকে চাপে ফেলতে পারে, কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করতে পারে কিংবা একটি নীতি পরিবর্তন করাতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

ক্ষোভকে সংগঠিত করা তুলনামূলক সহজ; সেই শক্তিকে নীতিমালা, প্রতিষ্ঠান, নেতৃত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া অনেক কঠিন।

ককরোচ আন্দোলনের সামনেও তাই বড় প্রশ্ন, এটি কি কেবল প্রতিবাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হয়ে থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে কোনো স্থায়ী নাগরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়।

সরকারের জন্য বার্তাটি কী?

তবে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ যা-ই হোক, সরকারের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট।

তরুণদের ক্ষোভকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ দমন-পীড়নের প্রতিটি ছবি ও ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে।

তার চেয়ে বেশি কার্যকর হলো সংলাপ, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি।

চাকরি, শিক্ষা, দুর্নীতি, নিয়োগ ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো বাস্তব সমস্যার সমাধান ছাড়া কোনো সরকার শুধু প্রচারণার মাধ্যমে দীর্ঘদিন তরুণদের আস্থা ধরে রাখতে পারবে না।

নতুন রাজনৈতিক ব্যাকরণ

ককরোচ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই, রাজনীতির ভাষা বদলে যাচ্ছে।

আগের প্রজন্মের রাজনৈতিক ভাষায় ছিল মিছিল, পোস্টার, সভা, দলীয় কার্যালয় ও দীর্ঘ বক্তৃতা। নতুন প্রজন্মের ভাষায় যুক্ত হয়েছে মিম, ভিডিও, ব্যঙ্গ, তথ্য যাচাই, ভাইরাল কনটেন্ট এবং স্বতঃস্ফূর্ত ডিজিটাল সংগঠন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রচলিত রাজনীতি শেষ হয়ে যাচ্ছে। বরং প্রচলিত রাজনীতির সঙ্গে নতুন ডিজিটাল নাগরিক রাজনীতির সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার, দক্ষিণ এশিয়ার তরুণেরা আর কেবল ভবিষ্যতের ভোটার নয়। তারা বর্তমানের রাজনৈতিক শক্তি।

তারা প্রশ্ন করছে, তথ্য চাইছে, প্রতিবাদ করছে এবং প্রয়োজনে ক্ষমতাকেও চাপের মুখে ফেলছে। ফলে যে রাজনৈতিক দল বা সরকার এই পরিবর্তন বুঝতে ব্যর্থ হবে, তার জন্য ভবিষ্যতের পথ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।

‘তেলাপোকা’ হয়তো একটি শব্দমাত্র। কিন্তু সেই শব্দকে নিজেদের পরিচয় বানিয়ে তরুণেরা যে বার্তা দিয়েছে, তা অনেক বড়, অপমানকে ভয় না পেয়ে সেটিকেই যদি প্রতিরোধের ভাষায় পরিণত করা যায়, তাহলে রাজনীতির পুরোনো ব্যাকরণ বদলে যেতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সেই পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে তরুণ প্রজন্ম।

ফরহাদ সবুজ, সংগঠক, অল্টারনেতিভস