নিকোলা টেসলা মাই ইনভেনশন বই অবলম্বনে
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
মানুষের এগিয়ে চলার মূলে আছে উদ্ভাবন। এটিই আমাদের সৃজনশীল মনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। উদ্ভাবনের উদ্দেশ্য প্রকৃতির শক্তিকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো। চিন্তাশক্তির মাধ্যমে প্রকৃতিকে আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু একজন উদ্ভাবকের পথ সহজ নয়। তাঁকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। অনেক সময় তিনি প্রাপ্য স্বীকৃতিও পান না। ভুল বোঝাবুঝি ও অবহেলাও সঙ্গী হয় তাঁর। তবু নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারার আনন্দই তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার। তখন তিনি বুঝতে পারেন, তিনি সেই সৌভাগ্যবান মানুষদের একজন, যাঁদের অক্লান্ত প্রচেষ্টা না থাকলে মানবসভ্যতা এত দূর এগোতে পারত না।
আমার নিজের জীবনেও সেই আনন্দের অভাব ছিল না; বরং প্রয়োজনের চেয়েও বেশি পেয়েছি। বহু বছর ধরে আমি যেন একধরনের মুগ্ধতার মধ্যেই বেঁচে ছিলাম। অনেকে আমাকে খুব পরিশ্রমী মানুষ বলে। চিন্তাকেই যদি পরিশ্রম ধরা হয়, তাহলে হয়তো কথাটি সত্যি। কারণ, জেগে থাকা প্রায় প্রতিটি মুহূর্তই আমি চিন্তা করে কাটিয়েছি। কিন্তু কাজ বলতে যদি নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ম মেনে কোনো দায়িত্ব পালন করাকে বোঝায়, তাহলে হয়তো অলসদের তালিকায় আমার নামই সবার আগে থাকবে। বাধ্য হয়ে কোনো কাজ করতে আমার কখনোই ভালো লাগেনি। আমি সব সময় নিজের চিন্তাশক্তির ওপর ভরসা করেছি। সেই চিন্তাই আমাকে পথ দেখিয়েছে, আনন্দ দিয়েছে এবং জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলো এনে দিয়েছে।
আমার নিজের জীবনেও সেই আনন্দের অভাব ছিল না; বরং প্রয়োজনের চেয়েও বেশি পেয়েছি। বহু বছর ধরে আমি যেন একধরনের মুগ্ধতার মধ্যেই বেঁচে ছিলাম।
ইলেকট্রিক্যাল এক্সপেরিমেন্টারের সম্পাদকদের অনুরোধে, বিশেষ করে তরুণ পাঠকদের কথা ভেবেই আমি এই লেখাগুলো লিখছি। এখানে আমি আমার জীবনের ঘটনাগুলো যতটা সম্ভব সত্য ও ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরব। তাই আমাকে ফিরে যেতে হবে শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলোতে। আবার মনে করতে হবে সেই সব ঘটনা, মানুষ আর অভিজ্ঞতার কথা, যেগুলো আমার জীবন ও ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
জীবনের একেবারে শুরুর দিকের চেষ্টাগুলো আসে সহজাত প্রবৃত্তি থেকে। সেগুলোকে চালিত করে কল্পনা, যার তখনো কোনো লাগাম থাকে না। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তিবোধ শক্তিশালী হয়। তখন আমরা আরও পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে শিখি। তবু শৈশবের সেই প্রথম দিকের প্রবণতাগুলোকে কখনোই তুচ্ছ করে দেখা উচিত নয়। সেগুলো হয়তো তখনই কোনো ফল দেয় না, কিন্তু ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে দেয়। আজ মনে হয়, ছোটবেলাতেই যদি আমার সেই প্রবণতাগুলোকে ঠিকভাবে বুঝতে পারতাম এবং বিকশিত করার সুযোগ পেতাম, তাহলে মানবজাতির জন্য আরও অনেক কিছু করতে পারতাম। কিন্তু বড় হওয়ার আগে আমি নিজেই বুঝতে পারিনি, আমার ভেতরে একজন উদ্ভাবক লুকিয়ে আছে।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথমত, আমার এক বড় ভাই ছিল ডেন। সে ছিল অসাধারণ মেধাবী। ১২ বছর বয়সেই সে মারা যায়। সেই শোক থেকে আমার মা-বাবা আর কখনো পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেননি।
আমাদের একটি অসাধারণ অ্যারাবিয়ান ঘোড়া ছিল। পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু সেটি উপহার দিয়েছিল। প্রাণীটি ছিল যেমন সুন্দর, তেমন বুদ্ধিমান। পরিবারের সবাই ওকে খুব ভালোবাসত। একবার ঘোড়াটা এমন একটি কাজ করেছিল, যা না হলে আমার বাবার জীবনই হয়তো রক্ষা পেত না।


এক শীতের রাতে জরুরি কাজে বাবাকে বাড়ির বাইরে যেতে হয়। নেকড়ের উপদ্রবে ভরা সেই দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে এগোনোর সময় হঠাৎ আতঙ্কে শিউরে উঠে ঘোড়াটি উন্মাদের মতো ছুট লাগাল। বাবা ছিটকে পড়েন বরফঢাকা মাটিতে। কিছুক্ষণ পর ঘোড়াটি একাই বাড়িতে ফিরে আসে। তখন ঘোড়ার সারা শরীরে ক্লান্তির ছাপ, আচরণে স্পষ্ট অস্থিরতা। সবাই বুঝতে পারে, কিছু একটা ঘটেছে। বাড়ির লোকজন বেরিয়ে পড়ে। আশ্চর্যের বিষয়, ঘোড়াটিই সবাইকে পথ দেখিয়ে আবার ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে তারা বাবাকে অচেতন অবস্থায় খুঁজে পায়। জ্ঞান ফেরার পর ঘোড়ায় চেপে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি।
প্রায় এক ঘণ্টা তিনি বরফের ওপর অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন। এই ঘোড়াটির কারণেই পরে আমার ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছিল। ঘোড়াটির জোর ধাক্কায় মারাত্মক আহত হয়েছিল আমার ভাই। সেই আঘাতের ফলেই পরে তার মৃত্যু হয়। সেই দৃশ্য আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম। আজ ছাপ্পান্ন বছর পেরিয়ে গেছে, তবু সেই ঘটনার স্মৃতি আমার চোখে একদম স্পষ্ট, একটুও ম্লান হয়নি। আমার ভাইয়ের অসাধারণ প্রতিভা ও কৃতিত্বের কথা মনে হলে নিজের যেকোনো সাফল্যই আমার কাছে তুচ্ছ বলে মনে হতো।
জীবনের একেবারে শুরুর দিকের চেষ্টাগুলো আসে সহজাত প্রবৃত্তি থেকে। সেগুলোকে চালিত করে কল্পনা, যার তখনো কোনো লাগাম থাকে না। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তিবোধ শক্তিশালী হয়।
আমাদের একটি অসাধারণ অ্যারাবিয়ান ঘোড়া ছিল। পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু সেটি উপহার দিয়েছিল। প্রাণীটি ছিল যেমন সুন্দর, তেমন বুদ্ধিমান। পরিবারের সবাই ওকে খুব ভালোবাসত। একবার ঘোড়াটা এমন একটি কাজ করেছিল, যা না হলে আমার বাবার জীবনই হয়তো রক্ষা পেত না।
এক শীতের রাতে জরুরি কাজে বাবাকে বাড়ির বাইরে যেতে হয়। নেকড়ের উপদ্রবে ভরা সেই দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে এগোনোর সময় হঠাৎ আতঙ্কে শিউরে উঠে ঘোড়াটি উন্মাদের মতো ছুট লাগাল। বাবা ছিটকে পড়েন বরফঢাকা মাটিতে। কিছুক্ষণ পর ঘোড়াটি একাই বাড়িতে ফিরে আসে। তখন ঘোড়ার সারা শরীরে ক্লান্তির ছাপ, আচরণে স্পষ্ট অস্থিরতা। সবাই বুঝতে পারে, কিছু একটা ঘটেছে। বাড়ির লোকজন বেরিয়ে পড়ে। আশ্চর্যের বিষয়, ঘোড়াটিই সবাইকে পথ দেখিয়ে আবার ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে তারা বাবাকে অচেতন অবস্থায় খুঁজে পায়। জ্ঞান ফেরার পর ঘোড়ায় চেপে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি।
প্রায় এক ঘণ্টা তিনি বরফের ওপর অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন। এই ঘোড়াটির কারণেই পরে আমার ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছিল। ঘোড়াটির জোর ধাক্কায় মারাত্মক আহত হয়েছিল আমার ভাই। সেই আঘাতের ফলেই পরে তার মৃত্যু হয়। সেই দৃশ্য আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম। আজ ছাপ্পান্ন বছর পেরিয়ে গেছে, তবু সেই ঘটনার স্মৃতি আমার চোখে একদম স্পষ্ট, একটুও ম্লান হয়নি। আমার ভাইয়ের অসাধারণ প্রতিভা ও কৃতিত্বের কথা মনে হলে নিজের যেকোনো সাফল্যই আমার কাছে তুচ্ছ বলে মনে হতো।
এক শীতের রাতে জরুরি কাজে বাবাকে বাড়ির বাইরে যেতে হয়। নেকড়ের উপদ্রবে ভরা সেই দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে এগোনোর সময় হঠাৎ আতঙ্কে শিউরে উঠে ঘোড়াটি উন্মাদের মতো ছুট লাগাল।
আমি যতই ভালো কিছু করি না কেন, তা যেন বাবা-মায়ের মনে তাঁদের হারিয়ে যাওয়া ছেলের শোক আরও গভীর করে তুলত। ফলে ছোটবেলা থেকেই নিজের প্রতি আমার খুব একটা আস্থা ছিল না। তবে আমাকে যে একেবারে নির্বোধ ছেলে মনে করা হতো, তা নয়। একটি ছোট্ট ঘটনা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে।
এক দিন শহরের কয়েকজন সম্মানিত ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন, যেখানে আমি অন্য ছেলেদের সঙ্গে খেলছিলাম। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ এক ধনী ভদ্রলোক আমাদের প্রত্যেককে একটি করে রুপার মুদ্রা দিচ্ছিলেন। আমার সামনে এসে তিনি থেমে গেলেন। আমার দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার চোখের দিকে তাকাও।’
কাঙ্ক্ষিত মুদ্রাটি পাওয়ার আশায় আমি হাত বাড়িয়ে তাঁর চোখের দিকে তাকালাম। কিন্তু তিনি মুদ্রাটি সরিয়ে নিয়ে হেসে বললেন, ‘না, তোমাকে এটা দিতে পারি না। তুমি বড়ই চালাক ছেলে!’
আমাকে নিয়ে আরেকটি মজার গল্প আমাদের পরিবারে বেশ প্রচলিত ছিল। আমার দুই বয়স্ক খালা ছিলেন। দুজনের মুখেই বয়সের ছাপ স্পষ্ট। তাঁদের একজনের হাতির দাঁতের মতো সাদা দুটি দাঁত ঠোঁটের বাইরে বেরিয়ে থাকত। তিনি যখনই আমাকে আদর করে চুমু দিতেন, দাঁত দুটি আমার গালে বিঁধে যেত। ফলে এই স্নেহশীল কিন্তু দেখতে খুব একটা আকর্ষণীয় নয়, এমন দুই খালার কোলে যেতে হবে—এর চেয়ে ভয়ের আর কিছু আমার কাছে ছিল না।
কাঙ্ক্ষিত মুদ্রাটি পাওয়ার আশায় আমি হাত বাড়িয়ে তাঁর চোখের দিকে তাকালাম। কিন্তু তিনি মুদ্রাটি সরিয়ে নিয়ে হেসে বললেন, ‘না, তোমাকে এটা দিতে পারি না। তুমি বড়ই চালাক ছেলে!’
এক দিন আমি মায়ের কোলে বসেছিলাম। তখন তাঁরা মজা করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বল তো, আমাদের দুজনের মধ্যে কে বেশি সুন্দর?’
আমি খুব মনোযোগ দিয়ে দুজনের মুখের দিকে তাকালাম। তারপর একটু ভেবে একজনকে দেখিয়ে বললাম, ‘তিনি অন্যজনের মতো অত কুৎসিত নন।’
এ ছাড়া জন্মের পর থেকেই আমাকে ধর্মযাজক হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছিল। এই চিন্তা আমার মনে সব সময় একধরনের চাপ সৃষ্টি করে রাখত। অথচ আমার প্রবল ইচ্ছা ছিল প্রকৌশলী হওয়ার। কিন্তু বাবা ছিলেন খুব দৃঢ়চেতা মানুষ। সিদ্ধান্ত থেকে তাঁকে সরানো ছিল প্রায় অসম্ভব।

নিকোলা টেসলার বাবা ছিলেন খুব দৃঢ়চেতা মানুষ. ছবি: উইকিপিডিয়া
তিনি ছিলেন নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর এক অফিসারের সন্তান। তাঁর ভাই ছিলেন একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের গণিতের অধ্যাপক। তাঁদের দুজনেরই সামরিক শিক্ষা ছিল। কিন্তু পরে বাবা সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নেন। ধর্মযাজক হন তিনি। অল্প সময়ের মধ্যেই এ পেশায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।
তিনি ছিলেন অসাধারণ পাণ্ডিত্যসম্পন্ন মানুষ। একাধারে প্রকৃতিদার্শনিক, কবি ও লেখক। তাঁর ধর্মোপদেশ ছিল সাবলীল, প্রাণবন্ত এবং বাকপটু। অনেকে সেগুলোর তুলনা করতেন আব্রাহাম আ স্যাঙ্কটা-ক্ল্যারার বক্তৃতার সঙ্গে। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল বিস্ময়কর। বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য থেকে দীর্ঘ অংশ তিনি অনায়াসে মুখস্থ আবৃত্তি করতে পারতেন। মজা করে প্রায়ই বলতেন, চিরায়ত সাহিত্যের কোনো রচনা যদি এক দিন হারিয়েও যায়, তবে তিনি স্মৃতি থেকে তা হুবহু লিখে দিতে পারবেন।
আমার বাবা ছিলেন নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর এক অফিসারের সন্তান। তাঁর ভাই ছিলেন একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের গণিতের অধ্যাপক। তাঁদের দুজনেরই সামরিক শিক্ষা ছিল।
লেখক হিসেবেও আলাদা পরিচিতি ছিল তাঁর। তিনি ছোট ছোট, তীক্ষ্ণ ও ঝরঝরে বাক্যে লিখতেন। তাঁর লেখায় থাকত বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা ও সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ। দুটি এমন মিলেমিশে থাকত, যা সহজেই পাঠকের মনে দাগ কাটত। তাঁর রসবোধ ছিল পুরোপুরি নিজস্ব। দুটি ছোট উদাহরণ দিচ্ছি।
আমাদের খামারে কাজ করত ‘মানে’ নামে এক লোক। লোকটি ছিল ট্যারা। এক দিন সে কাঠ কাটছিল। কুঠার তুলে কোপ দিতে যাবে, এমন সময় বাবা তার চোখের দিকে তাকিয়ে একটু অস্বস্তি নিয়ে বললেন, ‘ঈশ্বরের দোহাই, মানে! যেদিকে তাকিয়ে আছ, সেদিকে কোপ দিও না; যেখানে কোপ দিতে চাও, সেদিকে দাও!’
আরেক দিন তিনি এক বন্ধুকে নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে বেরিয়েছেন। গল্পে মশগুল হয়ে বন্ধুটি খেয়ালই করেননি যে তাঁর দামি পশমের কোট গাড়ির চাকার সঙ্গে ঘষা খাচ্ছে। বাবা শান্তভাবে বললেন, ‘কোটটা একটু ভেতরে টেনে নাও। নইলে আমার গাড়ির টায়ারটাই নষ্ট হয়ে যাবে!’
নিজের সঙ্গে কথা বলার এক অদ্ভুত অভ্যাস ছিল তাঁর। কখনো নিজের কণ্ঠস্বর বদলে তিনি এমনভাবে কথোপকথন চালিয়ে যেতেন, শুনে মনে হতো, ঘরে একাধিক লোক আছে। কখনো সেই কথাবার্তা উত্তপ্ত তর্কের রূপ নিত। বাইরে থেকে কোনো অপরিচিত লোক শুনলে নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করত, ঘরের ভেতরে অন্তত দু-তিনজন মানুষ আলোচনা করছে।
গল্পে মশগুল বন্ধুটি খেয়াল করেননি যে তাঁর দামি পশমের কোট গাড়ির চাকার সঙ্গে ঘষা খাচ্ছে। বাবা শান্তভাবে বললেন, ‘কোটটা একটু ভেতরে টেনে নাও। নইলে আমার গাড়ির টায়ারটাই নষ্ট হয়ে যাবে!’
আমার উদ্ভাবনী ক্ষমতার উত্তরাধিকার আমি মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলাম। তবু বাবার দেওয়া শিক্ষাও আমাকে কম সাহায্য করেনি। তিনি নিয়মিত এমন সব অনুশীলন করাতেন, যা স্মৃতি, মনোযোগ ও চিন্তাশক্তিকে শাণিত করত। কখনো আমি আর বাবা একজন আরেকজনের মনের কথা অনুমান করার চেষ্টা করতাম। কখনো কোনো বাক্য বা লেখার ত্রুটি খুঁজে বের করতাম। আবার কখনো দীর্ঘ বাক্য হুবহু মুখস্থ বলে যেতে হতো, কিংবা মনে মনে জটিল অঙ্ক কষতে হতো। এসব অনুশীলনের উদ্দেশ্য ছিল স্মৃতিশক্তি, যুক্তিবোধ ও সূক্ষ্ম বিচারক্ষমতা গড়ে তোলা। আজ বুঝতে পারি, সেগুলো সত্যিই কাজে দিয়েছে।
আমার মা দেশের এক প্রাচীন ও সম্মানিত পরিবারের মেয়ে ছিলেন। তাঁদের বংশে উদ্ভাবনের এক দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। তাঁর বাবা এবং দাদা দুজনই গৃহস্থালি, কৃষিকাজ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা কাজে ব্যবহারের জন্য নতুন যন্ত্র ও সরঞ্জাম তৈরি করেছিলেন। মা ছিলেন অসাধারণ দক্ষ, সাহসী এবং অদম্য মানসিক শক্তির অধিকারী। জীবনে তিনি একের পর এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু কখনো ভেঙে পড়েননি।

নিকোলা টেসলার মা দেশের এক প্রাচীন ও সম্মানিত পরিবারের মেয়ে ছিলেন। ছবি: উইকিপিডিয়া
মায়ের বয়স যখন মাত্র ১৬, তখন আমাদের অঞ্চলে ভয়াবহ মহামারি দেখা দেয়। তাঁর বাবা আক্রান্ত মানুষদের শেষ ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করতে বাড়ির বাইরে গিয়েছিলেন। সেই সময় পাশের একটি পরিবারও মহামারিতে আক্রান্ত হয়। বাবা বাড়িতে না থাকায় মা একাই তাঁদের সাহায্যে এগিয়ে যান। পরিবারের পাঁচজন সদস্যই অল্প সময়ের ব্যবধানে মারা যান। মা নিজ হাতে তাঁদের শরীর ধুয়ে পরিষ্কার করেন। পোশাক পরিয়ে দেন। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী ফুল দিয়ে সাজিয়ে সমাধির জন্য প্রস্তুত করে রাখেন। তাঁর বাবা ফিরে এসে দেখেন, খ্রিষ্টীয় রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্যের সব প্রস্তুতিই সম্পন্ন হয়ে গেছে।
মায়ের বয়স যখন মাত্র ১৬, তখন আমাদের অঞ্চলে ভয়াবহ মহামারি দেখা দেয়। তাঁর বাবা আক্রান্ত মানুষদের শেষ ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করতে বাড়ির বাইরে গিয়েছিলেন।
আমার মা জন্মগতভাবেই উদ্ভাবক ছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধার নাগাল যদি তাঁর হাতে থাকত, তবে তিনি অসাধারণ সব কাজ করতে পারতেন। এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তিনি নিজের প্রয়োজনেই নানা রকম যন্ত্র ও সরঞ্জাম বানাতেন। নিজের হাতে কাটা সুতা দিয়ে দৃষ্টিনন্দন নকশার কাপড় বুনতেন। এমনকি বীজ রোপণ করে সেখান থেকে নিজেই গাছ ফলাতেন, বড় করতেন, তারপর সেই গাছ থেকে আঁশ ছাড়িয়ে সুতা তৈরি করতেন। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করতেন । আমাদের পরার বেশির ভাগ কাপড়, এমনকি ঘরের অনেক আসবাবও ছিল তাঁর নিজের হাতে তৈরি। ৬০ বছর বয়স পার হওয়ার পরও তাঁর আঙুলের দক্ষতা এতটুকু কমেনি। তিনি অনায়াসে চোখের একটি পাপড়িতে তিনটি গিঁট বেঁধে দেখাতে পারতেন।
তবে আমার ভেতরের উদ্ভাবক সত্তা এত দেরিতে প্রকাশ পাওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ ছিল। ছোটবেলায় আমি এক অদ্ভুত সমস্যায় ভুগতাম। হঠাৎ হঠাৎ চোখের সামনে নানা রকমের ছবি ভেসে উঠত। প্রায়ই এর সঙ্গে থাকত তীব্র আলোর ঝলকানি। এতে বাস্তব জিনিস দেখা কঠিন হয়ে পড়ত। আমার চিন্তাভাবনা ও কাজের স্বাভাবিক ধারাও ব্যাহত হতো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এগুলো সবই ছিল এমন দৃশ্য বা বস্তুর ছবি, যা আমি আগে বাস্তবে দেখেছিলাম। কল্পনায় তৈরি কোনো ছবি কখনো এভাবে চোখের সামনে আসত না। কেউ কোনো বস্তুর নাম উচ্চারণ করলেই সেই বস্তুর একটি স্পষ্ট ছবি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত। অনেক সময় বুঝতেই পারতাম না, আমি সত্যিই কোনো বাস্তব জিনিস দেখছি, নাকি শুধু সেটার একটি মানসিক প্রতিচ্ছবি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে গভীর অস্বস্তি ও উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিত।
আমার মা জন্মগতভাবেই উদ্ভাবক ছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধার নাগাল যদি তাঁর হাতে থাকত, তবে তিনি অসাধারণ সব কাজ করতে পারতেন। এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।
মনোবিজ্ঞান ও শারীরবিদ্যার যাঁদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম, তাঁদের কেউই এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। ঘটনাটি তাঁদের কাছেও ছিল একেবারে অস্বাভাবিক। তবে আমার ধারণা, এই প্রবণতাটি বংশগত ছিল। কারণ, আমার ভাইয়ের মধ্যেও একই রকম লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। অনেক ভেবেচিন্তে আমি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। অতিরিক্ত স্নায়বিক উত্তেজনার ফলে মস্তিষ্ক থেকে রেটিনায় সৃষ্টি হওয়া একধরনের প্রতিফলিত স্নায়বিক ক্রিয়ার ফলেই এই ছবিগুলো দেখা দিত। এগুলো কোনোভাবেই অসুস্থ মনের বিভ্রম বা হ্যালুসিনেশন ছিল না। কারণ অন্য সব ক্ষেত্রে আমার বিচারবুদ্ধি ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। মনও ছিল শান্ত ও স্থির।
আমার কষ্টের মাত্রা বোঝাতে একটি উদাহরণ দিই। ধরুন, আমি কোনো শেষকৃত্য কিংবা তেমন বেদনাদায়ক কোনো দৃশ্য দেখেছি। তারপর রাতের নিস্তব্ধতায় যখন চারদিকে সব শান্ত হয়ে গেল, তখন সেই দৃশ্যের স্পষ্ট ছবি আবার জোর করে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত। আমি চোখ বন্ধ করলেও সেটি মিলিয়ে যেত না; বরং মনে হতো, দৃশ্যটি যেন সত্যিই আমার সামনে উপস্থিত।
সেই ছবিগুলো আমার চোখের সামনে ভেসে থাকত এবং যতই সেগুলো সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতাম, ততই যেন আরও স্থির হয়ে ঝুলে থাকত। এমনকি হাত বাড়িয়ে সেগুলোর ভেতরে নাড়ানোর চেষ্টা করলেও অনেক সময় মনে হতো, ছবিগুলো যেন বাতাসে স্থির হয়ে ঝুলে আছে।
অনেক ভেবেচিন্তে আমি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। অতিরিক্ত স্নায়বিক উত্তেজনার ফলে মস্তিষ্ক থেকে রেটিনায় সৃষ্টি হওয়া একধরনের প্রতিফলিত স্নায়বিক ক্রিয়ার ফলেই এই ছবিগুলো দেখা দিত।
আমার এই ব্যাখ্যা যদি সঠিক হয়ে থাকে, তবে মানুষের মনের মধ্যে যে ছবি তৈরি হয়, এক দিন তা কোনো পর্দায় প্রক্ষেপণ করে অন্যদেরও দেখানো সম্ভব হবে। এমন কিছু করা গেলে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের ধরনই আমূল বদলে যাবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এক দিন এই অসাধারণ সাফল্য অর্জিত হবেই। এ কথাও বলতে পারি, এই সমস্যার সমাধান নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরে অনেক ভেবেছি এবং এর পেছনে প্রচুর সময় ব্যয় করেছি।
দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার যখন এই প্রক্রিয়াটিকে মানসিকভাবে চেষ্টা করে চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতাম, তখন ধীরে ধীরে এই উপায়টির কার্যকারিতা কমে আসত। তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আমার কল্পনা পরিচিত জগতের সীমানা ছাড়িয়ে আরও দূরে চলে যেত। আমি একের পর এক নতুন দৃশ্য দেখতে শুরু করতাম। প্রথম দিকে সেগুলো ছিল অস্পষ্ট ও ঝাপসা। আমি মনোযোগ দিয়ে দেখতে গেলেই মিলিয়ে যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি সেগুলোকে স্থির রাখতে শিখলাম। ক্রমে সেগুলো আরও স্পষ্ট ও জীবন্ত হয়ে উঠত। এমনকি শেষ পর্যন্ত রূপ পেত বাস্তব বস্তুর মতোই।
খুব শিগগিরই বুঝতে পারলাম, আমার সবচেয়ে বড় স্বস্তি মেলে যখন কল্পনার জগতে আরও দূরে, আরও অজানা জায়গায় চলে যাই। একের পর এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। এভাবেই শুরু হলো আমার মানসিক ভ্রমণ। প্রতি রাতে, কখনো কখনো দিনের বেলাতেও যখন একা থাকতাম, আমি কল্পনায় যাত্রা শুরু করতাম। নতুন নতুন শহর, দেশ আর অচেনা জনপদে ঘুরে বেড়াতাম। সেখানে বাস করতাম। মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতাম। বন্ধুত্ব গড়ে তুলতাম। আশ্চর্যের বিষয়, সেই মানুষগুলো আমার কাছে বাস্তব জীবনের মানুষের মতোই প্রিয় হয়ে উঠেছিল। তাদের উপস্থিতিও ছিল খুব বাস্তব।
খুব শিগগিরই বুঝতে পারলাম, আমার সবচেয়ে বড় স্বস্তি মেলে যখন কল্পনার জগতে আরও দূরে, আরও অজানা জায়গায় চলে যাই। একের পর এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই।
আমি প্রায় ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত এভাবেই চলেছি। তারপর আমার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে উদ্ভাবন। তখন আনন্দের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, আমি অবলীলায় মনের মধ্যে যেকোনো কিছু কল্পনা করতে পারি। কোনো মডেল, নকশা বা পরীক্ষার প্রয়োজন হতো না; সবকিছুই আমি মনের চোখে বাস্তবের মতো স্পষ্ট দেখতে পেতাম। এভাবে অজান্তেই আমি উদ্ভাবনকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি নতুন পদ্ধতি গড়ে তুলেছিলাম। এটি প্রচলিত পরীক্ষানির্ভর পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীত। আমার বিশ্বাস, এটি অনেক বেশি দ্রুত ও কার্যকর।
কেউ যখন একটি অস্পষ্ট ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে যন্ত্র নির্মাণ শুরু করে, তখন অনিবার্যভাবেই সে যন্ত্রটির খুঁটিনাটি ও ত্রুটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একের পর এক পরিবর্তন ও উন্নতি করতে গিয়ে তার মনোযোগ ধীরে ধীরে মূল ধারণা থেকে সরে যায়। শেষ পর্যন্ত হয়তো কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়, কিন্তু প্রায়ই তার জন্য গুণগত মানের সঙ্গে আপস করতে হয়।
আমার পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো ধারণা মাথায় আসা মাত্র আমি তা মনের মধ্যে নির্মাণ করতে শুরু করতাম। তার কাঠামো বদলাতাম। প্রয়োজনমতো উন্নতি করতাম। তারপর কল্পনার মধ্যেই সেটি চালিয়ে দেখতাম। আমার টারবাইন কারখানায় চলছে নাকি শুধু আমার কল্পনায়, এ দুটির মধ্যে আমার কাছে কোনো পার্থক্য ছিল না। এমনকি সেটি ভারসাম্য রেখে চলছে কি না, তাও আমি নির্ভুলভাবে বুঝতে পারতাম। ফলাফলেও কখনো কোনো পার্থক্য হতো না। কোনো যন্ত্র বাস্তবে তৈরি না করেই আমি এর বিকাশ ঘটাতে, পরিমার্জন করতে এবং চূড়ান্ত রূপ দিতে পারতাম।

আমার পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো ধারণা মাথায় আসা মাত্র আমি তা মনের মধ্যে নির্মাণ করতে শুরু করতাম। তার কাঠামো বদলাতাম। প্রয়োজনমতো উন্নতি করতাম।
যখন নিশ্চিত হতাম যে সম্ভাব্য সব উন্নতিই সম্পন্ন হয়েছে এবং কোথাও আর কোনো ত্রুটি নেই, তখনই সেই মানসিক সৃষ্টিকে বাস্তব রূপ দিতাম। আশ্চর্যের বিষয়, আমার যন্ত্র বাস্তবে ঠিক সেভাবেই কাজ করত, যেভাবে আমি কল্পনা করেছিলাম। পরীক্ষার ফলও আমার প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যেত। ২০ বছরের অভিজ্ঞতায় এর একটি ব্যতিক্রমও ঘটেনি। ঘটবেই-বা কেন? প্রকৌশল বৈদ্যুতিক হোক বা যান্ত্রিক, তা মূলত নির্ভুল বৈজ্ঞানিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এমন কোনো সমস্যা নেই, যা গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করা যায় না, কিংবা বিদ্যমান তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক তথ্যের ভিত্তিতে যার ফল আগে থেকে নির্ণয় করা অসম্ভব। তাই কেবল একটি অস্পষ্ট ধারণা নিয়ে সরাসরি নির্মাণকাজে নেমে পড়াকে আমি সব সময় শক্তি, অর্থ ও সময়ের অপচয় বলেই মনে করেছি।
তবে শৈশবের সেই যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার একটি ইতিবাচক দিকও ছিল। নিরবচ্ছিন্ন মানসিক অনুশীলন আমার পর্যবেক্ষণশক্তিকে অসাধারণ করে তুলেছিল। আমাকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছিল। আমি খেয়াল করলাম, প্রতিটি দৃশ্য বা ছবি মনে আসার আগে কোনো না কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে বাস্তব কোনো বস্তুকে দেখার অভিজ্ঞতা থাকে। তাই প্রতিবারই আমি সেই প্রথম উদ্দীপনাটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম। কিছুদিনের মধ্যেই এই প্রচেষ্টা প্রায় স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে। খুব সহজেই আমি কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক খুঁজে পেতে শিখে যাই।
নিরবচ্ছিন্ন মানসিক অনুশীলন আমার পর্যবেক্ষণশক্তিকে অসাধারণ করে তুলেছিল। আমাকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছিল।
অল্পদিনের মধ্যেই বিস্ময়ের সঙ্গে বুঝতে পারলাম, আমার প্রতিটি চিন্তার পেছনেই রয়েছে বাইরের কোনো উদ্দীপনা। শুধু চিন্তাই নয়, আমার প্রতিটি কাজও একইভাবে কোনো না কোনো বাহ্যিক প্রভাব দিয়ে পরিচালিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠল। আমি আসলে একধরনের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রমাত্র, যে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত উদ্দীপনায় সাড়া দেয় এবং সেই অনুযায়ী চিন্তা ও কাজ করে।
এই উপলব্ধিরই ব্যবহারিক ফল ছিল টেলঅটোমেটিকসের ধারণা। যদিও এখন পর্যন্ত এটি খুব সীমিত আকারেই বাস্তবায়িত হয়েছে, তবু এর সুপ্ত সম্ভাবনা এক দিন অবশ্যই সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পাবে। এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। বহু বছর ধরে আমি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র নিয়ে কাজ করছি। আমার বিশ্বাস, এমন যন্ত্র নির্মাণ করা সম্ভব, যা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বুদ্ধিমান সত্তার মতো আচরণ করতে পারবে। সেদিন বাণিজ্য ও শিল্পক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হবে।
আমার বয়স যখন প্রায় ১২ বছর, তখন প্রথমবারের মতো আমি ইচ্ছাশক্তির জোরে চোখের সামনে ভেসে ওঠা কোনো দৃশ্য সরিয়ে দিতে সক্ষম হই। কিন্তু যে আলোকচ্ছটার কথা আগে বলেছি, তার ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ওগুলোই ছিল সম্ভবত আমার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং সবচেয়ে দুর্বোধ্য অভিজ্ঞতা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠল। আমি আসলে একধরনের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রমাত্র, যে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত উদ্দীপনায় সাড়া দেয় এবং সেই অনুযায়ী চিন্তা ও কাজ করে।
সাধারণত আমি যখন কোনো বিপজ্জনক বা অত্যন্ত বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতাম অথবা প্রবল আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে পড়তাম, তখনই এই আলোকচ্ছটাগুলো দেখা দিত। কয়েকবার এমনও হয়েছে, আমার চারপাশের পুরো বাতাস যেন আগুনের শিখায় ভরে উঠেছে বলে মনে হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর তীব্রতা কমার বদলে আরও বেড়েছে। আমার বয়স যখন পঁচিশ, তখন তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
১৮৮৩ সালে প্যারিসে থাকাকালে একজন খ্যাতনামা ফরাসি শিল্পপতি আমাকে শিকারে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। আমি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করি। দীর্ঘদিন কারখানার ভেতরে বন্দী থাকার পর খোলা আকাশের নিচে নির্মল বাতাসে বেরিয়ে পড়া আমার শরীর ও মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সেদিন রাতে শহরে ফিরে মনে হলো, যেন আমার মস্তিষ্কে আগুন জ্বলছে। আমি এমন একটি আলো দেখছিলাম, যেন মাথার ভেতরে একটি ছোট সূর্য জ্বলছে। সারা রাত মাথায় বরফ-ঠান্ডা পানির জলপট্টি দিয়ে কাটিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত আলোকচ্ছটার তীব্রতা ও ঘনত্ব কমতে শুরু করলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় লেগেছিল। পরে দ্বিতীয়বার যখন আবার আমাকে শিকারে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়, তখন আমি দৃঢ়ভাবে না বলেছি।
এই উজ্জ্বল আলোকচ্ছটাগুলো এখনও মাঝে মধ্যে দেখা দেয়। বিশেষ করে যখন এমন কোনো নতুন ধারণা মাথায় আসে, যা আমার সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। তবে এখন আর এগুলো আগের মতো তীব্র বা উত্তেজনাপূর্ণ নয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এদের শক্তিও অনেকটা কমে এসেছে।
সারা রাত মাথায় বরফ-ঠান্ডা পানির জলপট্টি দিয়ে কাটিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত আলোকচ্ছটার তীব্রতা ও ঘনত্ব কমতে শুরু করলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় লেগেছিল।
আমি যখন চোখ বন্ধ করি, তখন প্রথমেই একটি গাঢ় নীল রঙের পটভূমি দেখতে পাই। অনেকটা মেঘ ছাড়া তারাবিহীন রাতের আকাশের মতো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই নীল পটভূমি অসংখ্য উজ্জ্বল সবুজ কণায় ভরে ওঠে। কণাগুলো যেন সারি বেঁধে আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। তারপর ডান দিকে দুটি সমান্তরাল রেখার একটি মনোরম নকশা ফুটে ওঠে। রেখাগুলো পরস্পরের সঙ্গে সমকোণে অবস্থান করে। হলুদ-সবুজ ও সোনালি রঙের নানা আভায় ঝলমল করতে থাকে।
এরপর রেখাগুলো ক্রমশ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং পুরো দৃশ্যটি অসংখ্য ঝিকিমিকি আলোর বিন্দুতে ভরে যায়। ধীরে ধীরে এই দৃশ্যটি আমার দৃষ্টিসীমা অতিক্রম করে বাঁ দিকে সরে যায়। প্রায় ১০ সেকেন্ড পর তা মিলিয়ে যায়। এর জায়গায় থেকে যায় একটি নিস্তেজ, প্রাণহীন ধূসর রং। অল্পক্ষণের মধ্যেই সেই ধূসর স্তরটি মেঘে আচ্ছন্ন সমুদ্রের মতো রূপ নেয়। মনে হয় এরা যেন নানা আকৃতি ধারণ করার চেষ্টা করছে। আশ্চর্যের বিষয়, এই দ্বিতীয় পর্যায়টি শুরু না হওয়া পর্যন্ত আমি ওই ধূসর পটভূমির ওপর কোনো কল্পিত ছবি ফুটিয়ে তুলতে পারি না।
প্রতিদিন ঘুমিয়ে পড়ার আগে নানা মানুষ ও বস্তুর ছবি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেগুলো দেখা দিলেই বুঝতে পারি, আমি ঘুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আর সেদিন যদি সেগুলো না আসে কিংবা আসতে না চায়, তবে আমি নিশ্চিত বুঝে যাই যে সারা রাত আর আমার ঘুম হবে না।
কণাগুলো যেন সারি বেঁধে আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। তারপর ডান দিকে দুটি সমান্তরাল রেখার একটি মনোরম নকশা ফুটে ওঠে। রেখাগুলো পরস্পরের সঙ্গে সমকোণে অবস্থান করে।
শৈশবে আমার কল্পনাশক্তি কত গভীরভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছিল, তার আরেকটি উদাহরণ দিই। অন্য সব শিশুর মতো আমিও লাফাতে খুব ভালোবাসতাম। ধীরে ধীরে বাতাসে ভেসে থাকার এক প্রবল আকাঙ্ক্ষা আমার মধ্যে জন্ম নেয়। মাঝেমধ্যে পাহাড় থেকে অক্সিজেনসমৃদ্ধ প্রবল বাতাস নেমে আসত। তখন আমার শরীর এত হালকা মনে হতো, যেন কর্কের তৈরি। সেই সময় আমি অনেক উঁচুতে লাফিয়ে দীর্ঘক্ষণ শূন্যে ভেসে আছি বলে অনুভব করতাম। অনুভূতিটি ছিল অপূর্ব। পরে যখন বুঝলাম সেটি কেবলই আমার কল্পনার সৃষ্টি, তখন ভীষণ হতাশ হয়েছিলাম।
সেই সময়ে আমার মধ্যে নানা রকম অদ্ভুত পছন্দ-অপছন্দ ও অভ্যাস গড়ে উঠেছিল। এর কিছু আমি বাইরের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি। আবার কিছু আজও আমার কাছে রহস্যই রয়ে গেছে। নারীদের কানের দুল আমার একেবারেই সহ্য হতো না। তবে অন্য ধরনের অলংকার, বিশেষ করে ব্রেসলেট আমাকে কমবেশি আকৃষ্ট করত। মুক্তা দেখলে আমার প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার উপক্রম হতো। অথচ স্ফটিক কিংবা ধারালো প্রান্ত ও মসৃণ পৃষ্ঠবিশিষ্ট চকচকে বস্তু আমাকে অদ্ভুতভাবে টানত।
অন্যের চুলে হাত দিতে হলে আগে যদি আমি রিভলভারের নল স্পর্শ না করতাম, তবে চুলে হাত দিতে পারতাম না। পীচ ফলের দিকে তাকালেই আমার জ্বর আসত। আবার ঘরে কোথাও এক টুকরো কর্পূর থাকলেও তীব্র অস্বস্তি অনুভব করতাম। এখনও এই ধরনের কয়েকটি অনুভূতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
অন্য সব শিশুর মতো আমিও লাফাতে খুব ভালোবাসতাম। ধীরে ধীরে বাতাসে ভেসে থাকার এক প্রবল আকাঙ্ক্ষা আমার মধ্যে জন্ম নেয়। মাঝেমধ্যে পাহাড় থেকে অক্সিজেনসমৃদ্ধ প্রবল বাতাস নেমে আসত।
তরলভর্তি কোনো পাত্রে কাগজের ছোট একটি টুকরো ফেলতে দেখলে আমার মুখে এক অদ্ভুত ও অত্যন্ত অপ্রীতিকর স্বাদ তৈরি হতো। হাঁটার সময় আমি পায়ের প্রতিটি ধাপ গুনতাম। স্যুপের বাটি, কফির কাপ কিংবা খাবারের পরিমাণও হিসাব করতাম। তা না হলে খাওয়ায় যেন কোনো আনন্দই পেতাম না।
আমার প্রতিটি কাজই ৩ সংখ্যার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্কিত হতে হতো। কোনো কিছু যদি ৩ দিয়ে বিভাজ্য না হতো, তাহলে অস্বস্তি বোধ করতাম। কখনো ভুল হয়ে গেলে আবার প্রথম থেকে শুরু করতাম। দরকার হলে এতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যেত।
আট বছর বয়স পর্যন্ত আমার স্বভাব ছিল দুর্বল ও দ্বিধাগ্রস্ত। কোনো বিষয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সাহস বা মানসিক শক্তি আমার ছিল না। আমার অনুভূতিগুলো ছিল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। মুহূর্তে মুহূর্তে এক চরম অবস্থা থেকে আরেক চরম অবস্থায় দুলে বেড়াত। আমার আকাঙ্ক্ষাগুলোও ছিল অসংখ্য; যেন হাইড্রার মাথার মতো—একটিকে দমন করলে আরেকটি জন্ম নিত। জীবন ও মৃত্যুর চিন্তা আমাকে তাড়িয়ে বেড়াত। ধর্মীয় ভয়, কুসংস্কার, শয়তান, ভূতপ্রেত আর অন্ধকারের অজানা শক্তির ভয়ে আমি প্রায় সব সময় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে থাকতাম।
তারপর হঠাৎই আমার জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা আমার সমগ্র জীবনকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিল।
আট বছর বয়স পর্যন্ত আমার স্বভাব ছিল দুর্বল ও দ্বিধাগ্রস্ত। কোনো বিষয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সাহস বা মানসিক শক্তি আমার ছিল না। আমার অনুভূতিগুলো ছিল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো।
সবকিছুর মধ্যে বইই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয়। বাবার ছিল সমৃদ্ধ এক গ্রন্থাগার। সুযোগ পেলেই আমি সেখানে গিয়ে বই পড়তাম। কিন্তু বাবা বিষয়টি মোটেই পছন্দ করতেন না। আমাকে পড়তে দেখলেই তিনি রেগে যেতেন। এমনকি আমি লুকিয়ে পড়ি বুঝতে পেরে তিনি মোমবাতিও লুকিয়ে রাখতেন। তাঁর ভয় ছিল, অতিরিক্ত পড়াশোনায় আমার চোখ নষ্ট হয়ে যাবে।
কিন্তু তাতেও আমি থামিনি। চর্বি জোগাড় করে নিজেই পলতে ও মোম বানিয়ে নিতাম। তারপর রাতে দরজার চাবির ছিদ্র ও ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করে ভোর পর্যন্ত পড়তাম। তখন বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে থাকত। আর মা তাঁর প্রতিদিনের কঠোর কাজ শুরু করতেন।
এক দিন আমার হাতে আসে হাঙ্গেরীয় লেখক মিকলোস ইয়োসিকার উপন্যাস আবাফি-র সার্বীয় অনুবাদ। বইটি যেন আমার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা ইচ্ছাশক্তিকে জাগিয়ে তুলেছিল। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার অনুশীলন শুরু করলাম। প্রথম দিকে আমার সংকল্পগুলো এপ্রিল মাসের তুষারের মতো দ্রুত গলে যেত। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আমি নিজের দুর্বলতাকে জয় করতে শিখলাম। তখন প্রথমবারের মতো এমন এক আনন্দের স্বাদ পেলাম, যা আগে কখনো অনুভব করিনি—নিজের ইচ্ছাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারার আনন্দ।
এক দিন আমার হাতে আসে হাঙ্গেরীয় লেখক মিকলোস ইয়োসিকার উপন্যাস আবাফি-র সার্বীয় অনুবাদ। বইটি যেন আমার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা ইচ্ছাশক্তিকে জাগিয়ে তুলেছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণই আমার স্বভাবে পরিণত হলো। শুরুতে আমাকে নিজের ইচ্ছাগুলোকে দমন করতে হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে ইচ্ছা ও সংকল্প একাকার হয়ে গেল। বছরের পর বছর এই অনুশীলনের ফলে আমি নিজের ওপর এমন নিয়ন্ত্রণ অর্জন করলাম, যেসব নেশা অনেক শক্তিশালী মানুষকেও ধ্বংস করে দেয়, সেগুলোর সঙ্গেও আমি অনায়াসে লড়াই করতে পেরেছি।
জীবনের একের পর এক অভ্যাস ও আসক্তিকে আমি নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেছি। শুধু নিজের স্বাস্থ্য ও জীবনই রক্ষা করিনি, বরং যে বিষয়গুলোকে অনেকে ত্যাগ বা আত্মসংযম বলে মনে করেন, সেখান থেকেই আমি গভীর তৃপ্তি ও আনন্দ লাভ করেছি।
পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার পর আমার একটি সম্পূর্ণ মানসিক বিপর্যয় ঘটে। সেই অসুস্থতার সময় আমি অনেক অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য ঘটনা লক্ষ করি।
মনোবিজ্ঞান ও শারীরবিদ্যার শিক্ষার্থীদের সম্ভাব্য আগ্রহের কথা ভেবে সংক্ষেপে এই অসাধারণ অভিজ্ঞতাগুলোর কথা বলব। এই যন্ত্রণাদায়ক সময়টি আমার মানসিক বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পরে এর ছাপ পড়েছিল আমার কাজের মধ্যেও। এর আগে যেসব পরিস্থিতি ও পরিবেশ থেকে এসব ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে, তা বলা জরুরি। কারণ, সেখানেই হয়তো এর আংশিক ব্যাখ্যা লুকিয়ে আছে।
শৈশব থেকেই আমি নিজের প্রতি মনোযোগী হতে বাধ্য হয়েছিলাম। এতে প্রচুর কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, এটিই ছিল আমার জন্য এক ছদ্মবেশী আশীর্বাদ। এর মধ্য দিয়েই আমার জীবন রক্ষা পেয়েছে। এর ফলেই আমি আত্মসমালোচনা করতে শিখেছি এবং নিজের মনোজগতের দিকে দৃষ্টি দেওয়ার অমূল্য শিক্ষাও পেয়েছি। আধুনিক জীবনে কাজের চাপ অনেক। জ্ঞানের সব দরজা দিয়ে অবিরাম ভাবনার স্রোত আমাদের চেতনায় প্রবেশ করে। এই সবকিছুই জীবনকে নানাভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। বেশিরভাগ মানুষ বাইরের জগৎ পর্যবেক্ষণে এতই ব্যস্ত থাকে যে নিজের ভেতরে কী ঘটছে, তা আর খেয়াল করে না। অনেকেই এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন।
লাখ লাখ মানুষের অকালমৃত্যুর মূল কারণ এই উদাসীনতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। এমনকি যাঁরা নিজেদের ব্যাপারে সতর্ক, তাঁদের মধ্যেও একটি সাধারণ প্রবণতা দেখা যায়। তাঁরা কাল্পনিক বিপদ এড়াতে ব্যস্ত থাকেন, অথচ আসল বিপদ উপেক্ষা করে যান। ব্যক্তিমানুষের ক্ষেত্রে যা সত্য, একটি জাতির ক্ষেত্রেও তা কমবেশি প্রযোজ্য। উদাহরণ হিসেবে নিষেধাজ্ঞা আন্দোলন বা প্রোহিবিশন মুভমেন্টের কথা ধরা যাক। মদ্যপান বন্ধ করতে এই দেশে এখন কঠোর, এমনকি অসাংবিধানিক ব্যবস্থাও কার্যকর করার চেষ্টা চলছে। অথচ নির্মম সত্য হলো কফি, চা, তামাক, চুইংগাম ও অন্যান্য উত্তেজক দ্রব্য স্বাস্থ্যের জন্য অ্যালকোহলের চেয়েও বহুগুণ ক্ষতিকর। মানুষ খুব অল্প বয়স থেকেই এগুলো অবাধে গ্রহণ করে। মৃত্যুর পরিসংখ্যানও সে কথাই বলে।
বেশিরভাগ মানুষ বাইরের জগৎ পর্যবেক্ষণে এতই ব্যস্ত থাকে যে নিজের ভেতরে কী ঘটছে, তা আর খেয়াল করে না। অনেকেই এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন।
উদাহরণ হিসেবে বলি। ছাত্রজীবনে কফিপ্রেমীদের শহর ভিয়েনায় প্রকাশিত অকালমৃত্যুর শোকসংবাদ থেকে আমি জেনেছিলাম, সেখানে হৃদ্রোগে মৃত্যুর হার কখনো কখনো মোট মৃত্যুর ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাত। যেসব শহরে অতিরিক্ত চা পান করা হয়, সেখানেও অনুসন্ধান চালালে সম্ভবত একই চিত্রই দেখা যাবে। এই সুস্বাদু পানীয়গুলো মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম স্নায়ুতন্তুকে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে। ধীরে ধীরে সেগুলো নিঃশেষ করে ফেলে। রক্তসংবহন প্রক্রিয়াতেও এরা গুরুতর ব্যাঘাত ঘটায়। তাই এগুলো অবশ্যই পরিমিতভাবে উপভোগ করা উচিত। কারণ, এদের ক্ষতিকর প্রভাব খুব ধীরে এবং প্রায় অদৃশ্যভাবে কাজ করে।
অন্যদিকে তামাক সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চিন্তাভাবনায় সহায়তা করে। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক মৌলিক কাজ ও কঠোর পরিশ্রমের জন্য প্রয়োজনীয় তীক্ষ্ণতা ও একাগ্রতা কমিয়ে দেয়। চুইংগাম ক্ষণিকের জন্য উপকারে এলেও তা দ্রুত পরিপাক ও গ্রন্থির রস নিঃশেষ করে ফেলে। ফলে শরীরের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। সেই সঙ্গে যে অস্বস্তিকর অনুভূতির সৃষ্টি হয়, সে কথা না-ই বা বললাম। সামান্য পরিমাণে অ্যালকোহল টনিক বা উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে তা শরীরে বিষের মতো কাজ করে। সেই বিষ কোনো হুইস্কি থেকে আসুক কিংবা শরীরের ভেতরের শর্করা বা চিনি থেকেই তৈরি হোক না কেন।
তবে ভুলে গেলে চলবে না, এসব উপাদানই প্রাকৃতিক নিয়মের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এগুলো সবচেয়ে যোগ্যজনের বেঁচে থাকার কঠোর তবে ন্যায্য নীতিকে কার্যকর রাখতে প্রকৃতিকে সাহায্য করে। অতি উৎসাহী সংস্কারকদের মানুষের চিরকালীন একগুঁয়ে স্বভাবের কথাও মনে রাখা উচিত। এই স্বভাবের কারণেই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া নিষেধাজ্ঞার চেয়ে ‘নিজের মতো করতে দাও’ নীতিটি অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
সুস্বাদু পানীয়গুলো মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম স্নায়ুতন্তুকে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে। ধীরে ধীরে সেগুলো নিঃশেষ করে ফেলে। রক্তসংবহন প্রক্রিয়াতেও এরা গুরুতর ব্যাঘাত ঘটায়।
আসল কথা হলো, বর্তমান জীবনযাপনে আমাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য প্রকাশের জন্য কিছুটা উদ্দীপক বা উত্তেজক উপাদানের প্রয়োজন হয়। তবে একই সঙ্গে ক্ষুধা, ইচ্ছা ও প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সব ক্ষেত্রেই বজায় রাখতে হবে পরিমিতিবোধ। বহু বছর ধরে আমি ঠিক এভাবেই জীবন যাপন করে আসছি। এর ফলে শরীর ও মন উভয়কে আমি তরুণ রাখতে পেরেছি। এসব থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা সব সময় আমার কাছে সহজ বা আনন্দদায়ক ছিল না। কিন্তু আজ যে অসাধারণ অভিজ্ঞতাগুলো জমিয়েছি, সেগুলো মূলত সেই সংযমেরই পুরস্কার। আমার এই নীতি ও বিশ্বাসের কারণে দু-একজন মানুষও যেন অনুপ্রাণিত হয়, সে আশায় কয়েকটি ঘটনার কথা বলছি।
কিছুদিন আগের কথা। আমি হোটেলে ফিরছিলাম। প্রচণ্ড শীতের হাড়কাঁপানো এক রাত। চারপাশের মাটি পিচ্ছিল। আশপাশে কোনো ট্যাক্সিও ছিল না। আমার প্রায় অর্ধেক ব্লক পেছনে আরেকজন লোক হাঁটছিল। বোঝা যাচ্ছিল, সে-ও আমার মতোই যত দ্রুত সম্ভব আশ্রয়ে পৌঁছাতে চাইছে। হঠাৎ আমার পা দুটো পিছলে হাওয়ায় ভেসে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মস্তিষ্কে যেন এক আলোর ঝলকানি খেলে গেল। স্নায়ুগুলো সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল। মাংসপেশি সংকুচিত হলো। আমি শূন্যে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে সোজা হাতের ওপর ভর দিয়ে পড়ে গেলাম। তারপর এমনভাবে হাঁটা শুরু করলাম, যেন কিছুই ঘটেনি। ঠিক তখনই পেছনের সেই অপরিচিত ব্যক্তি দৌড়ে এসে আমাকে ধরে ফেলল।
সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার বয়স কত?’ আমি বললাম, ‘কেন, প্রায় ঊনষাট বছর। তাতে কী হয়েছে?’ লোকটি বলল, ‘অবিশ্বাস্য! কোনো বিড়ালকে এভাবে শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে নেমে আসতে দেখেছি। কিন্তু কোনো মানুষকে কখনো এভাবে পড়তে দেখিনি!’
মাংসপেশি সংকুচিত হলো। আমি শূন্যে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে সোজা হাতের ওপর ভর দিয়ে পড়ে গেলাম। তারপর এমনভাবে হাঁটা শুরু করলাম, যেন কিছুই ঘটেনি।
প্রায় এক মাস আগে আমি নতুন চশমা বানানোর জন্য এক চক্ষুবিশেষজ্ঞের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি নিয়মমতো আমার চোখ পরীক্ষা করলেন। বেশ খানিকটা দূর থেকে আমি যখন অনায়াসে সবচেয়ে ছোট অক্ষরগুলোও পড়ে ফেললাম, তিনি বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু যখন তাঁকে বললাম যে আমার বয়স ষাট পেরিয়ে গেছে, তখন তিনি যেন একেবারে বাক্রুদ্ধ হয়ে গেলেন।
আমার বন্ধুরা প্রায়ই বলে, আমার স্যুটগুলো আমার শরীরে হাতের দস্তানার মতো নিখুঁতভাবে লাগে। কিন্তু তারা জানে না, আমার সব পোশাকই আজ থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের মাপে তৈরি। এই দীর্ঘ সময়ে সেই মাপে একচুলও পরিবর্তন আসেনি। একইভাবে আমার ওজন এক পাউন্ডও বাড়েনি বা কমেনি।
এ প্রসঙ্গে একটি মজার ঘটনা বলা যেতে পারে। ১৮৮৫ সালের এক শীতের সন্ধ্যায় মিস্টার এডিসন, এডিসন ইলুমিনেটিং কোম্পানির প্রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড এইচ জনসন, কারখানার ম্যানেজার মিস্টার ব্যাচেলর এবং আমি—সবাই মিলে ৬৫ ফিফথ অ্যাভিনিউতে অবস্থিত কোম্পানির অফিসের ঠিক বিপরীত দিকের একটি ছোট দোকানে ঢুকলাম। সেখানে কেউ একজন উপস্থিত সবার ওজন অনুমান করার খেলা শুরু করলেন। আমাকেও ওজন মাপার যন্ত্রে দাঁড়াতে বলা হলো। এডিসন আমার সারা শরীর একবার ভালো করে দেখে বললেন, ‘টেসলার ওজন এক আউন্স কম-বেশি ঠিক ১৫২ পাউন্ড।’ সত্যিই তাঁর অনুমান ছিল একেবারে নিখুঁত। জামাকাপড় ছাড়া আমার ওজন ছিল ১৪২ পাউন্ড। আর আজও আমার ওজন ঠিক এটাই।
এডিসন আমার সারা শরীর একবার ভালো করে দেখে বললেন, ‘টেসলার ওজন এক আউন্স কম-বেশি ঠিক ১৫২ পাউন্ড।’ সত্যিই তাঁর অনুমান ছিল একেবারে নিখুঁত।
আমি ফিসফিস করে মিস্টার জনসনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এডিসন কীভাবে এত নিখুঁতভাবে আমার ওজন বলে দিলেন?’ তিনি গলা নামিয়ে বললেন, ‘শোনো, তোমাকে গোপনে বলছি, কিন্তু কাউকে বোলো না যেন। উনি দীর্ঘদিন শিকাগোর এক কসাইখানায় কাজ করেছেন। সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার শুকরের ওজন করতে হতো তাঁকে! সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এমন বলতে পারলেন!’
আমার বন্ধু অনারেবল চনসি এম ডিপিউ একবার তাঁর বানানো একটি রসিকতা এক ইংরেজকে শুনিয়েছিলেন। লোকটি নাকি তখন বেশ হতভম্ব মুখে তা শুনেছিল। কিন্তু ঠিক এক বছর পর হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠেছিল! সত্যি বলতে, জনসনের এই কৌতুকটির আসল মজা বুঝতে আমার তার চেয়েও বেশি সময় লেগেছিল।
যাই হোক, আমার এই চমৎকার শারীরিক সুস্থতা নিয়ম মেনে চলা ও পরিমিত জীবনযাপনের ফল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, শৈশব ও কৈশোরে অন্তত তিনবার অসুস্থতার কারণে আমি শারীরিকভাবে প্রায় ভেঙে পড়েছিলাম। চিকিৎসকেরা আমার বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, নিজের অজ্ঞতা ও খামখেয়ালিপনার কারণে আমি এমন সব বিপদ, জটিলতা ও দুর্যোগে জড়িয়ে পড়েছিলাম, যেগুলো থেকে যেন অলৌকিকভাবেই মুক্তি পেয়েছি।
অন্তত এক ডজনবার আমি ডুবে মরতে বসেছিলাম। বলা যায়, প্রায় জীবন্ত সেদ্ধ হতে হতে বেঁচেছি। চুল পরিমাণের জন্য পুড়ে ছাই হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছি। কখনো মাটির নিচে আটকা পড়েছি, কখনো পথ হারিয়ে ঠান্ডায় জমে মরে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। ক্ষ্যাপাটে কুকুর, বুনো শুকর এবং অন্যান্য হিংস্র প্রাণীর মুখ থেকেও অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছি। মারাত্মক সব ব্যাধি ও বিচিত্র সব দুর্ঘটনার মধ্য দিয়েও যে আমি আজ সুস্থ-সবলভাবে বেঁচে আছি, তা কোনো অলৌকিক ঘটনার চেয়ে কম নয়। এই ঘটনাগুলো যখনই মনে করি, তখনই আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়—আমার এই বেঁচে থাকা নিছক কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।
আমার বন্ধু অনারেবল চনসি এম ডিপিউ একবার তাঁর বানানো একটি রসিকতা এক ইংরেজকে শুনিয়েছিলেন। লোকটি নাকি তখন বেশ হতভম্ব মুখে তা শুনেছিল।
একজন উদ্ভাবকের সব প্রচেষ্টার লক্ষ্যই মূলত জীবন রক্ষার জন্য। তিনি প্রাকৃতিক শক্তিকে বশ করুন, যন্ত্রের উন্নতি ঘটান বা নতুন কোনো আরাম-আয়েশের উপায় সৃষ্টি করুন না কেন, তিনি আসলে আমাদের অস্তিত্বের নিরাপত্তাকেই আরও শক্ত করছেন। তা ছাড়া সাধারণ মানুষের তুলনায় বিপদের মুহূর্তে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতা একজন উদ্ভাবকের অনেক বেশি থাকে। কারণ, তিনি অন্যদের তুলনায় বেশি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। তিনি বিচক্ষণ ও সময়োপযোগী বুদ্ধির অধিকারী হন। আমার মধ্যে এই গুণ কতটা ছিল, তার অন্য কোনো প্রমাণ না থাকলেও আমার জীবনের ঘটনাগুলোই এর যথেষ্ট সাক্ষ্য বহন করে। দু-একটি ঘটনার কথা বললেই পাঠক নিজে এর বিচার করতে পারবেন।
একবারের ঘটনা। তখন আমার বয়স প্রায় ১৪ বছর। আমার সঙ্গে নদীতে গোসল করতে নামা কয়েকজন বন্ধুকে ভয় দেখানোর এক দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় এল। আমার পরিকল্পনা ছিল, পানির ওপর ভাসমান একটি দীর্ঘ কাঠের কাঠামোর নিচ দিয়ে ডুবসাঁতার কেটে অন্য প্রান্তে গিয়ে নিঃশব্দে ভেসে উঠব। হাঁসের মতো সাঁতার কাটা ও ডুব দেওয়া ছিল আমার সহজাত অভ্যাস। তাই কাজটি অনায়াসেই করতে পারব বলে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম।
পরিকল্পনামতো আমি পানিতে ঝাঁপ দিলাম এবং বন্ধুদের চোখের আড়ালে গিয়ে ঘুরে অন্য প্রান্তের দিকে দ্রুত সাঁতার কাটতে লাগলাম। কাঠের কাঠামোটি পার হয়ে এসেছি ভেবে আমি পানির ওপর মাথা তুললাম। কিন্তু হতাশ হয়ে দেখলাম, আমার মাথা সোজা গিয়ে একটি কাঠের বিমে ধাক্কা খেল। সঙ্গে সঙ্গে আবার ডুব দিলাম এবং দম ফুরিয়ে আসা পর্যন্ত প্রাণপণে সামনে এগোতে লাগলাম। দ্বিতীয়বার ওপরে উঠতে গিয়েও একই ঘটনা ঘটল। আবারও আমার মাথা সেই বিমে গিয়ে ঠেকল।
একবারের ঘটনা। তখন আমার বয়স প্রায় ১৪ বছর। আমার সঙ্গে নদীতে গোসল করতে নামা কয়েকজন বন্ধুকে ভয় দেখানোর এক দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় এল।
এবার আমি সত্যিই ভয় পেয়ে গেলাম এবং সম্পূর্ণ দিশাহারা হয়ে পড়লাম। এরপরও সব শক্তি একসঙ্গে করে তৃতীয়বারের মতো মরিয়া চেষ্টা করলাম, কিন্তু ফল হলো একই। শ্বাস আটকে রাখার যন্ত্রণা তখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। মাথা ঝিমঝিম করছিল। আমি স্পষ্ট অনুভব করছিলাম, আমি তলিয়ে যাচ্ছি।
ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন পরিস্থিতি একেবারেই আশাহীন বলে মনে হচ্ছিল, আমার চোখে আবার সেই পরিচিত আলোর ঝলকানি খেলে গেল। মাথার ওপরের কাঠের কাঠামোটির একটি স্পষ্ট ছবি যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল। আমি দেখতে পেলাম, (অথবা অনুমান করলাম) পানির ওপরের অংশ এবং বিমের ওপরের তক্তাগুলোর মাঝখানে খুব সামান্য একটি ফাঁক আছে। প্রায় জ্ঞান হারানোর উপক্রম অবস্থায় আমি ওপরের দিকে ভেসে উঠলাম। তক্তার সঙ্গে মুখ ঠেকিয়ে কোনোমতে কিছুটা বাতাস টেনে নিলাম। দুর্ভাগ্যবশত সেই বাতাসের সঙ্গে পানিও ভেতরে ঢুকে পড়ায় আমি প্রায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম।
স্বপ্নের মতো একই প্রক্রিয়াটি আমি কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করলাম। যতক্ষণ না প্রচণ্ড বেগে ধুকপুক করতে থাকা হৃদ্পিণ্ড কিছুটা শান্ত হলো এবং আমি নিজেকে সামলে নিতে পারলাম। এরপরও আমি বেশ কয়েকবার ডুব দিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু দিকনির্ণয়ের অনুভূতি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলায় প্রতিবারই ব্যর্থ হলাম। অবশেষে সেই মৃত্যুফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হই। ততক্ষণে আমার বন্ধুরা আমাকে মৃত ভেবে পানির নিচে আমার দেহ খুঁজতে শুরু করেছিল।
নিজের অসাবধানতার কারণেই সে বছরের গোসলের সব আনন্দ মাটি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই শিক্ষা আমি খুব বেশি দিন মনে রাখতে পারিনি। মাত্র দুই বছর পরই আরও ভয়াবহ এক বিপদের মুখোমুখি হলাম।
ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন পরিস্থিতি একেবারেই আশাহীন বলে মনে হচ্ছিল, আমার চোখে আবার সেই পরিচিত আলোর ঝলকানি খেলে গেল।
আমি তখন যে শহরে পড়াশোনা করতাম, তার পাশেই একটি বড় ময়দা বানানোর মিল ছিল। মিলের পাশে নদীর ওপর একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। সাধারণত বাঁধের ওপর দিয়ে মাত্র দুই-তিন ইঞ্চি পানি প্রবাহিত হতো। তাই সাঁতরে গিয়ে সেই বাঁধের ওপর ওঠা খুব একটা বিপজ্জনক খেলা ছিল না। আমি প্রায়ই এটা করতাম।
একইভাবে একদিন আনন্দের জন্য একাই নদীতে নেমে পড়লাম। পাকা বাঁধের খুব কাছাকাছি পৌঁছাতেই আতঙ্কের সঙ্গে বুঝতে পারলাম, নদীর পানি অনেক বেড়ে গেছে এবং প্রবল স্রোত আমাকে দ্রুত বাঁধের দিকে টেনে নিচ্ছে। ফিরে আসার চেষ্টা করলাম। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
ভাগ্যক্রমে দুই হাত দিয়ে বাঁধের দেয়াল শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিচে তলিয়ে যাওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারলাম। কিন্তু আমার বুকের ওপর পানির চাপ ছিল অসহনীয়। কোনোমতে মুখ পানির ওপরে ধরে রাখাই কঠিন হয়ে উঠেছিল। আশপাশে কোনো মানুষের সাড়া ছিল না। আর জলপ্রপাতের প্রচণ্ড গর্জনে আমার আর্তচিৎকার সম্পূর্ণ চাপা পড়ে যাচ্ছিল।
ধীরে ধীরে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। শক্তি ফুরিয়ে এল। ঠিক যখন হাত ছেড়ে দিয়ে নিচের পাথরের ওপর আছড়ে পড়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই বলে মনে হচ্ছিল, তখনই আবার সেই পরিচিত আলোর ঝলকানি দেখা দিল। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল জলবিদ্যুৎ নীতির একটি পরিচিত চিত্র—‘চলমান তরলের চাপ তার উন্মুক্ত ক্ষেত্রফলের সমানুপাতিক।’ যেন কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমি সঙ্গে সঙ্গে বাঁ পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম।
যখন হাত ছেড়ে দিয়ে নিচের পাথরের ওপর আছড়ে পড়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই বলে মনে হচ্ছিল, তখনই আবার সেই পরিচিত আলোর ঝলকানি দেখা দিল।
মনে হলো যেন কোনো জাদুবলে বুকের ওপর থেকে চাপ অনেকটাই কমে গেল। আর ওই ভঙ্গিতে স্রোতের ধাক্কা সামলানোও তুলনামূলক সহজ হয়ে উঠল। কিন্তু বিপদ তখনো কাটেনি। জানতাম, দেড় ঘণ্টা কিংবা এক ঘণ্টা পর হলেও শেষ পর্যন্ত আমি তলিয়ে যাব। কারণ, কেউ আমাকে দেখতে পেলেও এত অল্প সময়ের মধ্যে এখানে সাহায্য পৌঁছাতে পারবে না।
আজ আমি দুই হাতই সমান দক্ষতায় ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু তখন আমি ছিলাম বাঁহাতি। ডান হাতে শক্তি ছিল অনেক কম। তাই শরীরের ভর অন্য পাশে সরিয়ে সামান্য বিশ্রাম নেওয়ার সাহসও পাচ্ছিলাম না। ফলে বাঁধ ঘেঁষে ধীরে ধীরে শরীর টেনে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ময়দার মিলের দিকে আমার মুখ করা ছিল। সেদিক থেকে আমাকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে হচ্ছিল। কারণ, ওপাশের স্রোত ছিল আরও দ্রুত এবং অনেক গভীর।
এটি ছিল দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক এক পরীক্ষা। একেবারে শেষ মুহূর্তে গিয়ে আমি প্রায় হেরেই গিয়েছিলাম। কারণ, বাঁধের সরলরেখার মাঝখানে একটি ঢালু গর্ত বা নিচু অংশ এসে পড়েছিল। শরীরের শেষ আউন্স শক্তিটুকু দিয়ে কোনোমতে সেই বাধা অতিক্রম করলাম। তারপর নদীর তীরে পৌঁছে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লাম। পরে সেখান থেকে আমাকে উদ্ধার করা হয়। আমার শরীরের বাঁ পাশের প্রায় পুরো চামড়া ছিলে গিয়েছিল। জ্বর সেরে পুরোপুরি সুস্থ হতে আমার কয়েক সপ্তাহ লেগেছিল।
কয়েক ডজন ঘটনার মধ্যে মাত্র দুটো উদাহরণ দিলাম। আমার বিশ্বাস, এই ঘটনাগুলোই প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট যে উদ্ভাবনী সত্তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না থাকলে আজ এই ঘটনাগুলো বলার জন্য আমি বেঁচে থাকতাম না।
একেবারে শেষ মুহূর্তে গিয়ে আমি প্রায় হেরেই গিয়েছিলাম। কারণ, বাঁধের সরলরেখার মাঝখানে একটি ঢালু গর্ত বা নিচু অংশ এসে পড়েছিল।
উৎসাহী মানুষ প্রায়ই আমাকে প্রশ্ন করেন, কীভাবে এবং কখন আমি প্রথম উদ্ভাবনের কাজ শুরু করেছিলাম? এর উত্তর আমি কেবল আমার এখনকার স্মৃতির আলোকে দিতে পারি। আমার মনে থাকা প্রথম চেষ্টাটি ছিল বেশ উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কারণ, এতে একটি যন্ত্রের উদ্ভাবন এবং একটি নতুন পদ্ধতির আবিষ্কার—দুটোই জড়িত ছিল। যন্ত্রটির ক্ষেত্রে অবশ্য অন্য কেউ আগেই এটি উদ্ভাবন করেছিলেন। মানে এটি মৌলিক কিছু ছিল না। তবে মাছ ধরার পদ্ধতিটি ছিল পুরোপুরি নিজস্ব।
ঘটনাটি ঘটেছিল এভাবে। আমার খেলার সঙ্গীদের একজন একটি আসল বড়শি ও ছিপ জোগাড় করে এনেছিল, যা আমাদের পুরো গ্রামেই বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরদিন সকালে সবাই মিলে ব্যাঙ ধরতে বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু সেই ছেলেটির সঙ্গে আমার ঝগড়া হওয়ায় ওরা আমাকে একলা ফেলে চলে যায়। এর আগে আমি কখনো আসল বড়শি দেখিনি। আমার কল্পনায় সেটি ছিল এক অদ্ভুত, প্রায় অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন বস্তু। ওদের সঙ্গে যেতে না পেরে আমি ভীষণ হতাশ হয়ে পড়লাম।
অভাবই তখন আমাকে নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য করল। কোনোমতে এক টুকরো নরম লোহার তার জোগাড় করলাম। দুটি পাথরের মাঝখানে রেখে পিটিয়ে এর এক মাথা ধারালো ও সুচালো করলাম। তারপর সেটি বাঁকিয়ে বড়শির আকৃতি দিলাম। পরে একটি শক্ত সুতোর সঙ্গে বেঁধে ফেললাম। এরপর একটি ছিপ কেটে কিছু টোপ সংগ্রহ করে সোজা চললাম সেই নালার ধারে, যেখানে প্রচুর ব্যাঙ ছিল।
আমার মনে থাকা প্রথম চেষ্টাটি ছিল বেশ উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কারণ, এতে একটি যন্ত্রের উদ্ভাবন এবং একটি নতুন পদ্ধতির আবিষ্কার—দুটোই জড়িত ছিল।
কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও একটা ব্যাঙ ধরতে পারছিলাম না। প্রায় হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। ঠিক তখন মাথায় একটি বুদ্ধি এল। গাছের গুঁড়িতে বসে থাকা একটি ব্যাঙের নাকের সামনে খালি বড়শিটি ঝুলিয়ে আস্তে আস্তে নাড়াতে শুরু করলাম। প্রথমে ব্যাঙটি কুঁকড়ে গেল। এরপর ধীরে ধীরে এর চোখ দুটি যেন কোটর থেকে বেরিয়ে এল এবং লালচে আভা ধারণ করল। মুহূর্তের মধ্যে সেটি ফুলে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বড় হয়ে উঠল এবং হিংস্র ভঙ্গিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে খালি বড়শিটিতে সজোরে কামড় বসাল।
আমি এক ঝটকায় সেটি টেনে তুললাম। মুহূর্তেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলাম। আমার এই অভিনব কৌশল দারুণ সফল হয়েছিল। এরপর একের পর এক ব্যাঙ ধরতে লাগলাম। সেদিন আমার সাফল্য ছিল এতই অবিশ্বাস্য যে বন্ধুরা ফিরে এসে আমার ধরা ব্যাঙের স্তূপ দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। ওরা অনেক চেষ্টা করেও আমার কৌশলের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি।
আজও সেই ঘটনাটি মনে পড়লে আমি বিস্মিত হই। কারণ, তখনো না জেনেই আমি উপলব্ধি করেছিলাম, জীবজন্তুর স্বভাব ও মানসিক প্রতিক্রিয়া কাজে লাগিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করা সম্ভব। সেটিই ছিল সম্ভবত একজন উদ্ভাবক হিসেবে আমার জীবনের প্রথম সাফল্য।
গাছের গুঁড়িতে বসে থাকা একটি ব্যাঙের নাকের সামনে খালি বড়শিটি ঝুলিয়ে আস্তে আস্তে নাড়াতে শুরু করলাম। প্রথমে ব্যাঙটি কুঁকড়ে গেল।
ব্যাঙ ধরার কৌশলটি বারবার প্রয়োগ করে দেখলাম, পদ্ধতিটি শতভাগ নির্ভুলভাবে কাজ করে! আমার সঙ্গীরা, যাদের হাতে সব আধুনিক সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও একটি ব্যাঙও ধরতে পারেনি, তারা এসে আমার কাণ্ড দেখে হিংসায় নীল হয়ে গেল। বেশ কিছুদিন এই রহস্য আমি নিজের কাছে গোপন রেখেছিলাম এবং একাই এর আনন্দ উপভোগ করেছি। তবে শেষ পর্যন্ত বড়দিনের উৎসবের আমেজে মন গলে গেল। কৌশলটি সবার কাছে খুলে বললাম। এরপর গ্রামের প্রতিটি ছেলে একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে শুরু করল। ফলে পরের গ্রীষ্মে ওই এলাকার ব্যাঙগুলোর ওপর নেমে এসেছিল এক মহাবিপর্যয়!
আমার পরের উদ্ভাবনী চেষ্টাতেও আমাকে চালিত করেছিল সেই সহজাত তাড়না। এটিই পরবর্তী জীবনে আমার সব কাজের মূল প্রেরণা হয়ে উঠেছিল। প্রাকৃতিক শক্তিকে মানবকল্যাণে লাগানোর আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। এবার আমি কাজে লাগিয়েছিলাম একধরনের মে-বাগ বা মে-পোকাকে। আমাদের এলাকায় এগুলোর ভয়ংকর উপদ্রব ছিল। কখনো কখনো এদের বিপুল সংখ্যার ওজনে গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ত। ঝোপঝাড়গুলো পোকার ভিড়ে প্রায় কালো হয়ে থাকত। আমি একটি চিকন দণ্ডের ওপর ঘুরতে পারে, এমন একটি ক্রসপিসে চারটি পোকা বেঁধে দিতাম এবং এদের ঘূর্ণনগতিকে একটি বড় চাকতি বা ডিস্কে সঞ্চালিত করে বেশ খানিকটা যান্ত্রিক শক্তি উৎপন্ন করতাম।
আমার পরের উদ্ভাবনী চেষ্টাতেও আমাকে চালিত করেছিল সেই সহজাত তাড়না। এটিই পরবর্তী জীবনে আমার সব কাজের মূল প্রেরণা হয়ে উঠেছিল।
এই প্রাণীগুলো ছিল বিস্ময়কর রকম কর্মঠ। একবার চলা শুরু করলে যেন থামতেই জানত না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এরা ঘুরেই যেত, আর পরিবেশ যত উত্তপ্ত হতো, এদের কাজের গতি তত বেড়ে যেত। সবকিছু চমৎকারভাবে চলছিল, যতক্ষণ না আমাদের এলাকায় এক অচেনা ছেলের আবির্ভাব ঘটে। সে ছিল অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ছেলে। সেই দুষ্ট ছেলেটি জীবন্ত মে-পোকাগুলো এমন তৃপ্তি করে কাঁচা চিবিয়ে খেত, যেন সেগুলো উৎকৃষ্ট মানের ব্লু-পয়েন্ট ঝিনুক! এই জঘন্য দৃশ্য দেখার পর সম্ভাবনাময় সেই গবেষণার সেখানেই ইতি ঘটে। এরপর থেকে আমি আর কোনো মে-পোকা, এমনকি অন্য কোনো কীটপতঙ্গও হাতে নেওয়ার সাহস করিনি।
এরপর আমি আমার নানার পুরোনো ঘড়িগুলো খুলে আবার জোড়া লাগানোর কাজে হাত দিয়েছিলাম। প্রথম কাজটি, অর্থাৎ ঘড়ি খোলার কাজটি আমি সব সময়ই সফলভাবে করতে পারতাম। কিন্তু দ্বিতীয় কাজটি, মানে সেগুলো আবার জোড়া লাগানো প্রায়ই ব্যর্থ হতো। ফলে নানা খুব একটা ভদ্রভাবে নয়, বরং বেশ কঠোরভাবেই আমার এই কর্মকাণ্ডের ইতি টানলেন। এরপর আরও প্রায় ৩০ বছর কেটে যায়। এর আগে আমি আর কোনো ঘড়ির যন্ত্রাংশে হাত দিইনি।
এর কিছুদিন পর আমি একধরনের পপ-গান বা তোপ-বন্দুক তৈরির কাজে মন দিলাম। এতে ছিল একটি ফাঁপা নল, একটি পিস্টন এবং শণ দিয়ে তৈরি দুটি প্লাগ। বন্দুকটি ছোড়ার সময় পিস্টনটি পেটের সঙ্গে চেপে ধরা হতো। আর দুই হাতে নলটি দ্রুত পেছনের দিকে টেনে আনতে হতো। এতে প্লাগ দুটির মাঝখানের বাতাস প্রচণ্ডভাবে সংকুচিত হয়ে উচ্চ তাপমাত্রা সৃষ্টি করত। এর চাপে একটি প্লাগ বিকট শব্দে ছিটকে বেরিয়ে আসত। এই বিদ্যার মূল কৌশল ছিল ফাঁপা কাণ্ড থেকে সঠিক কোণের নলটি বেছে নেওয়া।
এর কিছুদিন পর আমি একধরনের পপ-গান বা তোপ-বন্দুক তৈরির কাজে মন দিলাম। এতে ছিল একটি ফাঁপা নল, একটি পিস্টন এবং শণ দিয়ে তৈরি দুটি প্লাগ।
বন্দুক বানানোর কাজে আমি বেশ ভালোই এগোচ্ছিলাম। কিন্তু আমার এই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যখন ঘরের জানালার কাচ ভাঙতে শুরু করল, তখন অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবেই আমার সেই উৎসাহে পানি ঢেলে দেওয়া হলো। ঠিকঠাক মনে পড়লে, এরপর আমি হাতের কাছে পাওয়া আসবাবের কাঠ দিয়ে তরবারি খোদাই করার কাজে লেগে পড়েছিলাম। তখন আমার ওপরে সার্বিয়ার জাতীয় কবিতার গভীর প্রভাব পড়েছিল। বীরদের বীরত্বগাথায় মুগ্ধ হয়ে থাকতাম আমি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভুট্টার কাণ্ডকে শত্রু কল্পনা করে তরবারির কোপে কেটে সাফ করে দিতাম। ফলে ফসলের যথেষ্ট ক্ষতি হতো। বিনিময়ে মায়ের কাছ থেকে বেশ কয়েকবার ভালো রকমের প্রহারও খেতে হয়েছে। আর সেগুলো কোনো নামমাত্র শাস্তি ছিল না; ছিল একেবারে খাঁটি, জোরালো মার।
বয়স তখনো ছয় বছর হয়নি। আমার জন্মস্থান স্মিলজান গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম বছরের পড়াশোনাও শেষ হয়নি। এর আগেই আমি এসবের পাশাপাশি আরও অনেক কিছুর অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছিলাম। এরপর আমরা কাছের ছোট শহর গোসপিচে চলে যাই। এই বাসস্থান পরিবর্তন আমার কাছে এক বিরাট বিপর্যয় বলেই মনে হয়েছিল। আমাদের কবুতর, মুরগি, ভেড়া আর রাজহাঁসের দুর্দান্ত পাল ছেড়ে আসতে বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল। সেই রাজহাঁসগুলো ভোরে মেঘের দেশে ডানা মেলত, আর সন্ধ্যায় খাবার শেষে নিখুঁত সামরিক শৃঙ্খলায় ফিরে আসত। এমন দৃশ্য দেখে আধুনিক যুগের সেরা বৈমানিকদের স্কোয়াড্রনও যেন লজ্জা পাবে!
বয়স তখনো ছয় বছর হয়নি। আমার জন্মস্থান স্মিলজান গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম বছরের পড়াশোনাও শেষ হয়নি।
নতুন বাড়িতে এসে আমি একেবারে বন্দী হয়ে পড়লাম। জানালার পাশে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় চলাফেরা করা অচেনা মানুষদের দেখতাম। আমার লাজুকতা খুব বেড়েছিল। রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো স্যুট-বুট পরা কোনো লোকের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে একটি গর্জন করা সিংহের সামনে দাঁড়ানো আমার কাছে বেশি স্বস্তিকর মনে হতো!
তবে আমার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হতো প্রতি রোববারে, যখন পরিপাটি পোশাক পরে গির্জায় উপাসনায় যোগ দিতে যেতাম। সেখানেই এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল, যার স্মৃতি মনে পড়লে পরবর্তী বহু বছর ধরে আমার রক্ত যেন টক দুধের মতো জমাট বেঁধে যেত। এটি ছিল গির্জায় আমার দ্বিতীয় দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতা। এর কিছুদিন আগে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি পুরোনো উপাসনালয়ে আমি এক রাতের জন্য আটকা পড়েছিলাম। যেখানে বছরে মাত্র একবার মানুষের যাতায়াত হতো। সেটিও ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। কিন্তু রোববারের এই ঘটনাটি ছিল এর চেয়েও অনেক বেশি বিব্রতকর।
শহরের এক ধনী ভদ্রমহিলা ছিলেন। তিনি সদালাপী ও ভালো মানুষ হলেও ভীষণ জাঁকজমকপ্রিয় ছিলেন। গাঢ় প্রসাধন মেখে, লম্বা ঝুলওয়ালা ট্রেইল গাউন পরে তিনি গির্জায় আসতেন। এক রোববার বেলফ্রিতে বা ঘণ্টাঘরে ঘণ্টা বাজানো শেষ করে আমি তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে আসছিলাম। ঠিক সেই সময় তিনি রাজকীয় ভঙ্গিতে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। অসাবধানতাবশত আমি লাফিয়ে গিয়ে তাঁর পোশাকের লম্বা ঝুলের ওপর পড়ে গেলাম।
তবে আমার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হতো প্রতি রোববারে, যখন পরিপাটি পোশাক পরে গির্জায় উপাসনায় যোগ দিতে যেতাম।
মুহূর্তেই বিকট শব্দে পোশাকটি ছিঁড়ে গেল। সেই শব্দ শুনে মনে হচ্ছিল, যেন একদল নতুন রিক্রুট একসঙ্গে ফাঁকা গুলি ছুড়েছে! রাগে আমার বাবার মুখ ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। তিনি আমার গালে আলতো করে একটি চড় মেরেছিলেন। জীবনে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া এটিই ছিল আমার একমাত্র শারীরিক শাস্তি। কিন্তু আজও যেন সেই চড়ের স্পর্শ আমি অনুভব করতে পারি। এরপর যে লজ্জা আর অপমানের মধ্যে পড়তে হয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সামাজিকভাবে আমি প্রায় একঘরে হয়ে পড়েছিলাম। পরে আরেকটি ঘটনা না ঘটলে হয়তো সেই অবস্থাই দীর্ঘদিন চলত।
শহরের এক উদ্যমী তরুণ ব্যবসায়ী একটি দমকল বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। নতুন একটি ফায়ার ইঞ্জিন কেনা হয়, সদস্যদের জন্য ইউনিফর্ম তৈরি করা হয় এবং কুচকাওয়াজ ও দমকলের কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ইঞ্জিনটি ছিল মূলত ১৬ জন মানুষের শক্তিতে চালিত একটি পাম্প, যা লাল ও কালো রঙে চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছিল।
এক দুপুরে এর আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার আয়োজন করা হলো। ইঞ্জিনটি নিয়ে যাওয়া হলো নদীর তীরে। পুরো শহরের মানুষ এই অভিনব দৃশ্য দেখার জন্য ভিড় জমাল। বক্তৃতা, আনুষ্ঠানিকতা এবং ধর্মীয় আচার শেষ হওয়ার পর পাম্প চালানোর নির্দেশ দেওয়া হলো। কিন্তু পাইপের মুখ দিয়ে এক ফোঁটা পানিও বের হলো না। অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও সমস্যার উৎস খুঁজে বের করতে পারছিলেন না।
আমার বাবার আমার গালে আলতো করে একটি চড় মেরেছিলেন। জীবনে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া এটিই ছিল আমার একমাত্র শারীরিক শাস্তি।
আমি যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছালাম, ততক্ষণে পুরো আয়োজনটি ব্যর্থ হওয়ার মুখে। যন্ত্রকৌশল সম্পর্কে তখন আমার কোনো জ্ঞানই ছিল না। বায়ুচাপ সম্পর্কেও প্রায় কিছুই জানতাম না। কিন্তু সহজাত প্রবৃত্তিতে পানিতে ডুবে থাকা সাকশন পাইপটি পরীক্ষা করে বুঝতে পারলাম, ভেতরের চাপে সেটি কোথাও দুমড়ে-মুচড়ে বন্ধ হয়ে গেছে।
আমি সঙ্গে সঙ্গে নদীতে নেমে পাইপটি সোজা করে দিলাম। আর সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড বেগে পানি বেরিয়ে এল। ফলে উপস্থিত অনেকের রোববারের ঝকঝকে পোশাক ভিজে একাকার হয়ে গেল। সিরাকিউজের রাস্তায় সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় আর্কিমিডিসের ‘ইউরেকা! ইউরেকা!’ বলে ছুটে বেড়ানোর ঘটনাও সম্ভবত এর চেয়ে বেশি আলোড়ন তুলতে পারেনি। আমাকে কাঁধে তুলে নেওয়া হলো। সেদিন আমি গোটা শহরের নায়ক হয়ে উঠলাম।
শহরে এসে আমি কলেজ বা সত্যিকারের জিমনেসিয়ামে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে চার বছরের তথাকথিত নরমাল স্কুলে ভর্তি হলাম। এই সময়েও আমার শৈশব-কৈশোরের নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা, দুষ্টুমি আর বিপদ-আপদ সমানতালে চলতে থাকল। আর এসবের মধ্যেই আমি এই অঞ্চলের সেরা কাক শিকারি হিসেবে এক অদ্ভুত খ্যাতি অর্জন করেছিলাম।
আমার কৌশল ছিল একেবারেই সহজ। আমি বনের মধ্যে গিয়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে কাকের ডাক নকল করতাম। সাধারণত দু-একটি কাক সাড়া দিত, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই কোনো না কোনো কাক উড়ে এসে কাছের ঝোপে বসত। তখন আমাকে শুধু এক টুকরো শক্ত কাগজ বা কার্ডবোর্ড ছুড়ে এর মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিতে হতো। ঝোপের ডালপালার ভেতর এটি নিজেকে সামলে ওঠার আগেই আমি লাফিয়ে গিয়ে ধরে ফেলতাম। এভাবেই ইচ্ছেমতো যত খুশি কাক ধরতে পারতাম।
শহরে এসে আমি কলেজ বা সত্যিকারের জিমনেসিয়ামে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে চার বছরের তথাকথিত নরমাল স্কুলে ভর্তি হলাম।
তবে একবার এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা কাকদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল। একদিন আমি এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে দুটি দারুণ কাক ধরে বাড়ি ফিরছিলাম। বনের সীমানা পেরোতেই দেখলাম, হাজার হাজার কাক একত্র হয়ে কানফাটা চিৎকার শুরু করেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই এরা আমাদের তাড়া করে উড়ে এল এবং চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। শুরুতে ব্যাপারটা বেশ মজার লাগছিল। কিন্তু হঠাৎ আমার মাথার পেছনে এমন জোরে আঘাত এল যে আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম। তারপর কাকগুলো আমার ওপর হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শেষ পর্যন্ত কাক দুটিকে ছেড়ে দিতেই হলো। কোনোমতে কাছের একটি গুহায় আশ্রয় নেওয়া আমার বন্ধুর কাছে পৌঁছে আমরা প্রাণে বাঁচলাম।
স্কুলের শ্রেণিকক্ষে রাখা কয়েকটি যন্ত্রের মডেল আমাকে ভীষণ আকৃষ্ট করত। সেখান থেকেই ওয়াটার টারবাইনের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মায়। আমি নিজেই অনেকগুলো ছোট টারবাইন বানিয়েছিলাম এবং সেগুলো চালিয়ে অপরিসীম আনন্দ পেতাম।
আমার জীবন কতটা অদ্ভুত ও বিস্ময়কর ছিল, তা বোঝাতে একটি ঘটনার কথা বলা যায়। এক চাচা আমার এসব খেলাধুলা বা উদ্ভাবনী শখ একেবারেই পছন্দ করতেন না। এ নিয়ে তিনি আমাকে একাধিকবার বকাঝকাও করেছেন। একদিন আমি নায়াগ্রা জলপ্রপাতের একটি বর্ণনা পড়ে গভীরভাবে মুগ্ধ হলাম। কল্পনায় সেখানে একটি বিশাল চাকা আঁকলাম, যা জলপ্রপাতের স্রোতে ঘুরবে। আমি চাচাকে বলেছিলাম, একদিন আমি আমেরিকায় যাব এবং এই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেব। ঠিক ত্রিশ বছর পর নায়াগ্রায় দাঁড়িয়ে আমি নিজের সেই কল্পনাকেই বাস্তবে রূপ নিতে দেখেছিলাম। মানুষের মনের এই রহস্যময় শক্তি দেখে আমি বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম।
স্কুলের শ্রেণিকক্ষে রাখা কয়েকটি যন্ত্রের মডেল আমাকে ভীষণ আকৃষ্ট করত। সেখান থেকেই ওয়াটার টারবাইনের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মায়।
এ ছাড়া আমি আরও নানা ধরনের বিচিত্র কলকবজা ও ছোটখাটো যন্ত্র বানিয়েছিলাম। সেগুলোর মধ্যে ছিল আমার তৈরি আরবালিস্ট। এটি একধরনের শক্তিশালী ধনুক। এটি ছিল নিঃসন্দেহে আমার বানানো যন্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে সফল। সেই ধনুক থেকে ছোড়া তীর নিমেষেই চোখের আড়ালে মিলিয়ে যেত। কাছ থেকে ছোড়া হলে তা এক ইঞ্চি পুরু পাইন কাঠের তক্তাও ভেদ করে চলে যেত। বারবার ধনুকের ছিলা পেটের সঙ্গে চেপে টানার ফলে আমার পেটের চামড়া যেন কুমিরের চামড়ার মতো শক্ত ও মোটা হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আজও আমি শক্ত নুড়ি-পাথর পর্যন্ত হজম করতে পারি। হয়তো সেটা সেই সময়কার পেটের কসরতেরই ফল!
পাশাপাশি গুলতি চালনায় আমার দক্ষতার কথা না বললেই নয়। সেই দক্ষতা প্রদর্শন করলে সেকালের নামজাদা অলিম্পিক দর্শকরাও নিশ্চয়ই বিস্মিত হয়ে যেত। প্রাচীন এই অস্ত্রটি নিয়ে আমার এমন একটি কীর্তির কথা বলব, যা পাঠকের বিশ্বাসকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে।
একদিন কাকার সঙ্গে নদীর ধারে হাঁটতে হাঁটতে আমি গুলতি ছোড়ার অনুশীলন করছিলাম। সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছিল। নদীর ট্রাউট মাছগুলোও বেশ চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। মাঝেমধ্যেই এরা পানির ওপর লাফিয়ে উঠছিল। অস্তগামী সূর্যের আলোয় এদের চকচকে শরীর পেছনের পাথরের পটভূমিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো ছেলেই হয়তো লাফিয়ে ওঠা মাছে আঘাত করতে পারত। কিন্তু আমি নিজের জন্য বেছে নিয়েছিলাম আরও কঠিন এক লক্ষ্য।
পাশাপাশি গুলতি চালনায় আমার দক্ষতার কথা না বললেই নয়। সেই দক্ষতা প্রদর্শন করলে সেকালের নামজাদা অলিম্পিক দর্শকরাও নিশ্চয়ই বিস্মিত হয়ে যেত।
আমি কী করতে যাচ্ছি, তা কাকার কাছে আগেভাগেই স্পষ্ট করে বলেছিলাম। আমার লক্ষ্য ছিল, এমনভাবে একটি পাথর ছুড়ব, যাতে সেটি শূন্যে থাকা মাছটির গায়ে আঘাত করে। পাশাপাশি মাছটিকে পেছনের পাথরের সঙ্গে চেপে ধরে এবং এক আঘাতেই সেটি দুই টুকরো করে ফেলে।
আমি যা বলেছিলাম, ঠিক সেটাই ঘটল। আমার কাকা এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন, যেন তিনি কোনো ভূত দেখেছেন। আতঙ্কে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, ‘ভেড রেট্রো, স্যাটানাস!’ মানে, ‘দূর হও, শয়তান!’ এরপর টানা কয়েক দিন তিনি আমার সঙ্গে একটি কথাও বলেননি।
আমার জীবনের অন্য সব রেকর্ড যত বড়ই হোক না কেন, সময়ের সঙ্গে সেগুলো হয়তো ম্লান হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, এই একটি কীর্তির ওপর ভর করেই আমি আরও এক হাজার বছর নিশ্চিন্তে ও তৃপ্তির সঙ্গে নিজের সাফল্যের স্মৃতি উপভোগ করে যেতে পারব।
