খেলা ডেস্ক
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে অন্তত চার আন্তর্জাতিক ম্যাচ সাফের আগে বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ, তবে হঠাৎ পাওয়া এই সুযোগ কাজে লাগানোর পরীক্ষাও কম নয়।
বাংলাদেশ ফুটবলের সামনে আচমকাই খুলে গেছে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার একটি নতুন দরজা। ভারতের নাম প্রত্যাহারের পর ফিফা আসিয়ান কাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ। বাফুফের সম্মতির পর ফিফা ও আয়োজকদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনও মিলেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। ফলে ইন্দোনেশিয়ার মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য আট দলের প্রতিযোগিতায় এবার লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা এই টুর্নামেন্ট। বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নয়; আসন্ন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে জাতীয় দলের প্রস্তুতি, খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এটি হতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মঞ্চ।

কঠিন গ্রুপেই বাংলাদেশের পরীক্ষা
মূলত ভারতের অংশ নেওয়ার কথা ছিল টুর্নামেন্টে। কিন্তু একই সময়ে ব্রাজিলের বিপক্ষে একটি বহুল আলোচিত আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের প্রস্তুতির কারণে ভারত আসিয়ান কাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেয়। এরপরই সুযোগ আসে বাংলাদেশের সামনে।
ফিফা বাংলাদেশের অংশগ্রহণে আগ্রহ আছে কি না, তা জানতে চাইলে বাফুফে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। জাতীয় দল কমিটির জরুরি বৈঠকে অংশগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়। এরপর অপেক্ষা ছিল আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের।
সেই অপেক্ষার অবসান হওয়ায় এখন বাংলাদেশের সামনে নতুন বাস্তবতা, অপ্রত্যাশিত সুযোগকে কতটা পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারে দলটি।
বাংলাদেশ ‘এ’ গ্রুপে খেলবে বলে জানা গেছে। সেখানে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এমন তিন দল, যাদের বিপক্ষে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা খুব বেশি নয়।
কাগজে-কলমে বাংলাদেশের জন্য এটি কঠিন গ্রুপ। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার ফুটবল অবকাঠামো, পেশাদার লিগ এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। তবে সেই কারণেই এই প্রতিযোগিতার গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশের জাতীয় দল দীর্ঘদিন ধরেই নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভাব, প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের অভিজ্ঞতার ঘাটতিতে ভুগছে। সেই জায়গায় তিনটি গ্রুপ ম্যাচের পাশাপাশি অবস্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলার সুযোগ দলটির জন্য বড় প্রাপ্তি।
টুর্নামেন্টের কাঠামো অনুযায়ী, গ্রুপ পর্ব শেষে প্রতিটি দলই আরও একটি স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ অন্তত চারটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবে। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে ফাইনাল, রানার্সআপ হলে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ, সব মিলিয়ে প্রতিটি ম্যাচেরই থাকবে প্রতিযোগিতামূলক গুরুত্ব।
শুধু অংশগ্রহণ নয়, প্রস্তুতিরও সুযোগ
নভেম্বরে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ সামনে রেখে বাংলাদেশের জন্য এই টুর্নামেন্টকে প্রস্তুতির আদর্শ মঞ্চ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
জাতীয় দলের কোচ ও টিম ম্যানেজমেন্টের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ হবে বিভিন্ন কৌশল পরীক্ষা করা। নতুন খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাচাই, দলের রক্ষণভাগের সমন্বয়, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণভাগের কার্যকারিতা, সবকিছুই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে মূল্যায়নের সুযোগ মিলবে।
বাংলাদেশের ফুটবলের একটি পুরোনো সমস্যা হলো, বড় টুর্নামেন্টের আগে প্রস্তুতি ম্যাচের সংখ্যা খুবই সীমিত থাকে। অনেক সময় কয়েক দিনের অনুশীলনের পরই দলকে বড় প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। ফলে পরিকল্পনা মাঠে প্রয়োগের আগেই টুর্নামেন্ট শেষ হয়ে যায়।
আসিয়ান কাপ সেই চিত্র বদলানোর সুযোগ এনে দিতে পারে।
ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো দলের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশ জয় পাবে কি না, সেটিই অবশ্য একমাত্র প্রশ্ন নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, চাপের মুখে দল কেমন খেলে, গোল হজম করার পর কীভাবে ম্যাচে ফিরে আসে, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে কতক্ষণ নিজেদের পরিকল্পনা ধরে রাখতে পারে এবং ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে খেলোয়াড়দের সিদ্ধান্ত কতটা পরিণত হয়।
আর্থিক দিক থেকেও স্বস্তি
বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আর্থিক সুবিধা।
ফিফার অর্থায়নে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় যাতায়াত, থাকা ও অন্যান্য আয়োজনের ব্যয় স্বাগতিক ও আয়োজকদের ব্যবস্থাপনায় হওয়ার কথা। ফলে বাফুফের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ পড়ছে না। অংশগ্রহণ ফি এবং ভালো ফলের ভিত্তিতে পুরস্কার অর্থ পাওয়ার সুযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ ফুটবলের বাস্তবতায় বিষয়টি মোটেও ছোট নয়।
জাতীয় দলের আন্তর্জাতিক সফর ও প্রস্তুতি নিয়ে বাফুফেকে প্রায়ই বাজেটের হিসাব করতে হয়। ফলে কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার আগে আর্থিক সক্ষমতাও একটি বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে প্রায় খরচ ছাড়াই একাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পাওয়া নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে আর্থিক সুবিধা কি কেবল অংশগ্রহণের আনন্দেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাফুফে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি ফুটবল উন্নয়নের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে?
সুযোগের সঙ্গে আছে চ্যালেঞ্জও
বাংলাদেশের সামনে সুযোগ যেমন বড়, চ্যালেঞ্জও তেমনি বাস্তব।
টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত এসেছে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে। ফলে খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি, ক্লাব ফুটবলের সূচি, ভ্রমণ, আবহাওয়া এবং দল গঠনের মতো বিষয়গুলো দ্রুত সমন্বয় করতে হবে।
হঠাৎ পাওয়া একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট অনেক সময় আশীর্বাদ হতে পারে, আবার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া সেটি দলের দুর্বলতাও প্রকাশ করে দিতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে এই কয়েকটি ম্যাচকে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করা।
জাতীয় দলের নির্বাচনে ধারাবাহিকতা থাকবে কি না, প্রবাসী ও দেশি খেলোয়াড়দের সমন্বয় কেমন হবে, নতুনদের সুযোগ দেওয়া হবে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তরও এই টুর্নামেন্টে মিলতে পারে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের ফুটবলে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি স্থায়ী খেলার ধরন। প্রতিপক্ষভেদে পরিকল্পনা বদলানো স্বাভাবিক, কিন্তু দলের একটি মৌলিক পরিচয় থাকা জরুরি। আসিয়ান কাপ সেই পরিচয় গড়ে তোলার ক্ষেত্র হতে পারে।

ফলাফল নয়, পারফরম্যান্সও গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের সমর্থকদের কাছে আন্তর্জাতিক ফুটবল মানেই আবেগ। একটি জয় যেমন মুহূর্তে আশার জোয়ার তৈরি করে, তেমনি একটি হার থেকে জন্ম নেয় হতাশা ও সমালোচনা।
তবে আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব যথেষ্ট হবে না।
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে বাংলাদেশ কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে কি না, গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারে কি না এবং চাপের সময় মানসিক দৃঢ়তা দেখাতে পারে কি না? এসবও গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
কারণ বাংলাদেশের ফুটবলের সামনে মূল প্রশ্নটি এখন শুধু একটি ম্যাচ জেতা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে একটি প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় দল গড়ে তোলা।
সাফের আগে বড় এক পরীক্ষা
নভেম্বরে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত প্রতিযোগিতা সেটিই। আসিয়ান কাপের চার বা তার বেশি ম্যাচ সাফের আগে জাতীয় দলের জন্য এমন অভিজ্ঞতা এনে দিতে পারে, যা কয়েক সপ্তাহের অনুশীলনে পাওয়া সম্ভব নয়।
শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে। আবার দুর্বলতা চিহ্নিত করেও সংশোধনের সময় পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশের ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অভিযোগ রয়েছে, পরিকল্পনার চেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল সিদ্ধান্ত বেশি দেখা যায়। কিন্তু ভারতের সরে দাঁড়ানোর পর পাওয়া এই সুযোগকে যদি বাফুফে শুধু একটি ‘অতিরিক্ত টুর্নামেন্ট’ হিসেবে না দেখে জাতীয় দলের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে এর মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।
হঠাৎ পাওয়া সুযোগ, এখন প্রয়োজন সঠিক ব্যবহার
ভারতের জায়গায় বাংলাদেশের আসিয়ান কাপে সুযোগ পাওয়া নিঃসন্দেহে ভাগ্যের সহায়তা। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভাগ্য দরজা খুলে দিতে পারে, ভেতরে গিয়ে জায়গা করে নিতে হয় নিজেদের পারফরম্যান্সে।
ইন্দোনেশিয়ার মাঠে বাংলাদেশের সামনে তাই শুধু চারটি ম্যাচ নয়, চারটি সম্ভাবনা। নতুন সমন্বয় তৈরি করার সম্ভাবনা, নতুন খেলোয়াড়কে যাচাই করার সম্ভাবনা, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান বোঝার সম্ভাবনা এবং সবচেয়ে বড় কথা—সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে আত্মবিশ্বাসী একটি দল গড়ে তোলার সম্ভাবনা।
লাল-সবুজের সামনে সুযোগটা এসেছে আচমকাই। এখন প্রশ্ন একটাই-
বাংলাদেশ কি এই সুযোগকে কেবল অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধ রাখবে, নাকি ইন্দোনেশিয়ার মাটিতে নতুন এক প্রতিযোগিতামূলক পরিচয়ের শুরু করতে পারবে?
