ক্রীড়া ডেস্ক | ৩ আগস্ট ২০২৬

বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে এসেছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। ব্যাপক সমালোচনা, আঞ্চলিক ফুটবল কনফেডারেশনগুলোর বিরোধিতা এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবল প্রশাসকদের আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি বাতিলের ঘোষণা দেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

১ আগস্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইনফান্তিনো বলেন, “এই প্রকল্পটি এমন মাত্রার বিভাজন সৃষ্টি করেছে, যা এর মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, প্রস্তাবটি আর এগিয়ে নেওয়া হবে না।”

কী ছিল বিতর্কিত পরিকল্পনা?

ফিফার পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক স্বত্ব ও আয়-সংশ্লিষ্ট অংশীদারিত্বে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হতো। এর মাধ্যমে একটি বহুজাতিক বিনিয়োগ কাঠামো গড়ে তুলে বিপুল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল।

সমালোচকদের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে ভবিষ্যৎ বিশ্বকাপ ও অন্যান্য বড় টুর্নামেন্ট থেকে অর্জিত আয়ের একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে চলে যেতে পারত, যা ফুটবলের স্বাধীনতা ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারত।

সদস্য দেশগুলোকে ৪ কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাব

পরিকল্পনাটির পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের প্রত্যেককে ৪ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ কোটি পাউন্ড) দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ফিফার যুক্তি ছিল, এই অর্থ অবকাঠামো উন্নয়ন, যুব ফুটবল, নারী ফুটবল এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যয় করা যাবে।

তবে সমালোচকদের দাবি, এই প্রস্তাব মূলত সদস্য দেশগুলোর সমর্থন নিশ্চিত করার একটি কৌশল ছিল এবং এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ফুটবলের বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

উয়েফার কঠোর অবস্থান

পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নেয় ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। সংস্থাটির ৫৫টি সদস্য দেশ ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে তারা বিশ্বকাপ বয়কটের মতো কঠোর পদক্ষেপ বিবেচনা করবে।

উয়েফার কর্মকর্তারা মনে করেন, বিশ্বকাপের মতো ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতার মালিকানা ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া ফুটবলের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ফিফার ভেতরেও তীব্র মতবিরোধ

বিতর্ক কেবল বাহিরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ফিফার অভ্যন্তরেও এই পরিকল্পনা নিয়ে গুরুতর মতবিরোধ দেখা দেয়।

ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (COO) কেভিন লামুর বলেন,

“এই প্রকল্পটি সম্পর্কে ফিফার নিজস্ব প্রশাসনকে প্রতারণার মাধ্যমে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল।”

অন্যদিকে ইনফান্তিনোর বৈশ্বিক কৌশল ও সুশাসনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো পদত্যাগ করে বলেন,

“এটি ফুটবলের জন্য একটি খারাপ চুক্তি এবং ফুটবলের ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখার শামিল।”

তার এই মন্তব্যের পর থেকেই পরিকল্পনাটি নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

অন্যান্য কনফেডারেশনও বিরোধিতা করে

উয়েফার পাশাপাশি বিশ্বের আরও অন্তত দুটি বড় আঞ্চলিক ফুটবল কনফেডারেশনও পরিকল্পনার বিরোধিতা করে। তাদের বক্তব্য ছিল, বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অধিকার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হলে ভবিষ্যতে ফুটবলের নীতিনির্ধারণ, সম্প্রচার অধিকার এবং প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

আপাতত বন্ধ হলো বিতর্ক

ফিফার এই সিদ্ধান্তের ফলে আপাতত বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব বিক্রির পরিকল্পনা স্থগিত হলো। তবে ফুটবলের বৈশ্বিক আয় বাড়ানো এবং সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন তহবিল বৃদ্ধির জন্য ভবিষ্যতে ফিফা নতুন কোনো আর্থিক মডেল প্রস্তাব করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্ব ফুটবলের অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে যে বিশ্বকাপের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতার মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সদস্য দেশ, কনফেডারেশন এবং ফুটবল সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের ঐকমত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।