স্বাস্থ্য ডেস্ক
বাংলাদেশে স্বল্পমূল্যে প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস ব্রয়লার মুরগি। তবে এটি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে কি না—এ প্রশ্ন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রয়লার মুরগি নিজে ক্ষতিকর নয়; বরং এর নিরাপত্তা নির্ভর করে খামার ব্যবস্থাপনা, অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং রান্নার পদ্ধতির ওপর।
ব্রয়লার মুরগি কি স্বাস্থ্যকর?
পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকদের মতে, সঠিকভাবে উৎপাদিত ব্রয়লার মুরগি উচ্চমানের লিন প্রোটিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন বি-৬, নিয়াসিন (ভিটামিন বি-৩), ফসফরাস, সেলেনিয়াম ও জিংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে। বিশেষ করে চামড়াবিহীন মুরগির মাংস পরিমিত পরিমাণে খাওয়া একটি স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সতর্কতা জরুরি
খামারে রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসার জন্য অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে ওষুধ ব্যবহার করলে সাধারণত সমস্যা হয় না। তবে জবাইয়ের আগে প্রয়োজনীয় অপেক্ষাকাল (Withdrawal Period) না মানলে মাংসে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে।
এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি বাড়তে পারে, যা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় উদ্বেগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
হরমোন নিয়ে প্রচলিত ধারণা কতটা সত্য?
অনেকের ধারণা, ব্রয়লার মুরগিকে দ্রুত বড় করতে নিয়মিত হরমোন প্রয়োগ করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
তাদের মতে, আধুনিক ব্রয়লার মুরগির দ্রুত বৃদ্ধি মূলত উন্নত জাত, পুষ্টিকর খাদ্য এবং আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনার ফল।
স্বাস্থ্যবিধি না মানলে বাড়তে পারে সংক্রমণের ঝুঁকি
খামারে পরিচ্ছন্নতার অভাব বা জবাই ও সংরক্ষণের সময় অসতর্কতার কারণে সালমোনেলা, ক্যাম্পিলোব্যাক্টারসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মাংসে থাকতে পারে। তাই মুরগির মাংস অবশ্যই ভালোভাবে সিদ্ধ বা রান্না করে খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাংসের অভ্যন্তর সম্পূর্ণ সেদ্ধ না হলে খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
দেশি নাকি ব্রয়লার—কোনটি বেশি পুষ্টিকর?
পুষ্টিবিদদের ভাষ্য, দেশি ও ব্রয়লার—উভয় ধরনের মুরগিই ভালো মানের প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস। স্বাদ, গঠন ও চর্বির পরিমাণে কিছু পার্থক্য থাকলেও পুষ্টিগুণের দিক থেকে বড় ধরনের পার্থক্য নেই।
তাদের মতে, মুরগির জাতের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ উৎপাদন, স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সঠিকভাবে রান্না করা।

নিরাপদে ব্রয়লার মুরগি খেতে যা করবেন
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয় অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন—
- বিশ্বস্ত বিক্রেতা বা অনুমোদিত খামার থেকে মুরগি কিনুন।
- দুর্গন্ধযুক্ত বা অস্বাভাবিক রঙের মাংস এড়িয়ে চলুন।
- কাঁচা ও রান্না করা মাংস আলাদা পাত্রে সংরক্ষণ করুন।
- রান্নার আগে ও পরে হাত, ছুরি এবং কাটিং বোর্ড ভালোভাবে পরিষ্কার করুন।
- মুরগির মাংস সম্পূর্ণ সিদ্ধ বা ভালোভাবে রান্না করে খান।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খামারে উৎপাদিত, সঠিকভাবে সংরক্ষিত এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে রান্না করা ব্রয়লার মুরগি সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী খাদ্য।
তাদের মতে, ব্রয়লার মুরগি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে সচেতনভাবে বিশ্বস্ত উৎস থেকে কেনা এবং নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করাই স্বাস্থ্য সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
