বিনোদন ডেস্ক:
একজন মানবাধিকারকর্মীর রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়া, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের ভয়াবহ বাস্তবতা—এসব নিয়েই নির্মিত হয়েছে আলোচিত রাজনৈতিক চলচ্চিত্র ‘সতলুজ’। মানবাধিকারকর্মী জসওয়ন্ত সিং খালরার জীবন ও সংগ্রাম থেকে অনুপ্রাণিত এই সিনেমা মুক্তির আগেই সেন্সর বিতর্ক, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে প্রত্যাহার এবং পরে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকেও সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এক নজরে
- সিনেমা: সতলুজ (পূর্বনাম: Punjab 95)
- ধরন: রাজনৈতিক ড্রামা
- পরিচালনা: হানি ত্রেহান
- অভিনয়ে: দিলজিৎ দোসাঞ্জ, সুবিন্দর ভিকি, অর্জুন রামপাল, গীতিকা বিদ্যা ওহলিয়ান, কানওয়ালজিৎ সিং
- ভাষা: হিন্দি ও পাঞ্জাবি
- দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট
- স্ট্রিমিং: জি৫
সেন্সর বিতর্ক থেকে ওটিটি
প্রথমে ‘পাঞ্জাব ৯৫’ নামে নির্মিত ছবিটি ২০২৩ সালে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে ভারতের কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড (সিবিএফসি) প্রায় ১২০টি কাটের নির্দেশ দিলে দীর্ঘ সময় মুক্তি আটকে থাকে। শেষ পর্যন্ত ‘সতলুজ’ নামে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি৫-এ মুক্তি পেলেও মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই এটি সরিয়ে নেওয়া হয়। ফলে ছবিটি ঘিরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সেন্সরশিপ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় নির্মিত গল্প
চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্র জসওয়ন্ত সিং খালরা—একজন ব্যাংক কর্মকর্তা, যিনি পাঞ্জাবে নিখোঁজ মানুষ ও অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ভয়াবহ চিত্র উন্মোচনের চেষ্টা করেন। তদন্তের একপর্যায়ে তিনি গণদাহ, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং প্রশাসনিক গোপনীয়তার নানা প্রমাণের মুখোমুখি হন। এরপর শুরু হয় সত্য উদ্ঘাটনের বিপজ্জনক লড়াই।
রাষ্ট্র বনাম মানবাধিকারের নির্মম বাস্তবতা
হানি ত্রেহান ছবিটিতে আশি ও নব্বইয়ের দশকের পাঞ্জাবের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং পুলিশের সীমাহীন ক্ষমতার ব্যবহারকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরেছেন। যদিও ঘটনাপ্রবাহ একটি নির্দিষ্ট সময় ও অঞ্চলে সীমাবদ্ধ, তবু রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন ছবিটিকে সর্বজনীন গুরুত্ব দিয়েছে।
চলচ্চিত্রটি দেখায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যখন জবাবদিহির বাইরে চলে যায়, তখন গণতান্ত্রিক কাঠামো কতটা বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে। সেই কারণেই ‘সতলুজ’ শুধু একটি রাজনৈতিক সিনেমা নয়; এটি রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও নাগরিক অধিকারের সম্পর্ক নিয়ে এক গভীর পর্যবেক্ষণ।

অভিনয়ে উজ্জ্বল দিলজিৎ
জসওয়ন্ত সিং খালরার চরিত্রে দিলজিৎ দোসাঞ্জ সংযত অথচ শক্তিশালী অভিনয় করেছেন। একজন সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তার ধীরে ধীরে সত্য অনুসন্ধানী মানবাধিকারকর্মীতে পরিণত হওয়ার যাত্রা তিনি বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
এসএসপি সুগ্গা চরিত্রে সুবিন্দর ভিকি ছবির অন্যতম শক্তিশালী উপস্থিতি। ক্ষমতার অহংকার, নিষ্ঠুরতা ও মানসিক নির্যাতনের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে তাঁর অভিনয়। অন্যদিকে তদন্ত কর্মকর্তা সমুদ্র সিংয়ের ভূমিকায় অর্জুন রামপালও সংযত অভিনয়ে গল্পকে এগিয়ে নিয়েছেন।
নির্মাণ ও চিত্রভাষা
চিত্রগ্রাহক কে ইউ মোহানন পাঞ্জাবের অন্ধকার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নিখুঁত ভিজ্যুয়াল ভাষায় তুলে ধরেছেন। রহস্য, থ্রিলার এবং রাজনৈতিক নাটকের মিশেলে নির্মিত এই চলচ্চিত্র দীর্ঘ হলেও গল্পের গতি ও আবহ দর্শককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ‘সতলুজ’
‘সতলুজ’ শুধু অতীতের একটি ঘটনার পুনর্নির্মাণ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, মানবাধিকার এবং সত্য অনুসন্ধানের মূল্য নিয়ে নির্মিত সময়োপযোগী এক রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। জাতীয় নিরাপত্তার আড়ালে সত্য গোপনের প্রবণতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নকে সামনে এনে ছবিটি দর্শককে কঠিন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
ছবির শেষ পর্যন্ত অনুরণিত হয় জসওয়ন্ত সিং খালরার সেই বার্তা—“কাউকে না কাউকে তো সামনে আসতেই হবে।” আর তাঁর আরেকটি উচ্চারণ, “আমি অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানাই,” চলচ্চিত্রটির মূল দর্শনকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।