আন্তর্জাতিক ডেস্ক

হিমালয়ের উঁচু পর্বতগুলোকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ভূখণ্ড হিসেবে কল্পনা করি। হাজার হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের দেয়াল, বরফে ঢাকা চূড়া আর বিশাল হিমবাহ যেন অপরিবর্তনীয়। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হিমালয়ের সেই দৃঢ় ভিত্তিই ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে সাম্প্রতিক ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যা সেই পরিবর্তনের আরেকটি ভয়ংকর স্মারক। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এই দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩৫৯ জন। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ, যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।

একটি পাহাড়ি অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ধস কীভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নদী, জনপদ, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শত শত কিলোমিটার এলাকার মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে—এই দুর্যোগ যেন তারই নির্মম উদাহরণ।

তবে বিজ্ঞানীদের সতর্ক পর্যবেক্ষণ হলো, এটিকে কেবল ‘একটি প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা’ হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না।

ধস থেকে বন্যা, তারপর একের পর এক বিপর্যয়

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নেপালের লাংটাং লিরুং অঞ্চলের উত্তর ঢালে একটি বড় বরফ ও পাথরের অংশ ধসে পড়ে। বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে এসে নদীর প্রবাহকে প্রভাবিত করে। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

পাহাড়ি দুর্যোগের সবচেয়ে ভয়ংকর বৈশিষ্ট্যই হলো এর ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া

একটি ধস নদীর গতিপথ বদলে দিতে পারে। নদীর পানি কোথাও আটকে গেলে অস্থায়ী বাঁধ তৈরি হতে পারে। পরে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে নিচের দিকে নেমে আসতে পারে হঠাৎ প্রবল পানির ঢল। পাহাড় থেকে নেমে আসা সেই পানির সঙ্গে যুক্ত হয় পাথর, কাদা, গাছপালা এবং অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ।

ফলে এটি শুধু বন্যা থাকে না; অনেক সময় তা রূপ নেয় ধ্বংসাত্মক ডেব্রিস ফ্লো বা ধ্বংসাবশেষবাহী প্রবল স্রোতে।

এই বিপর্যয়ে সীমান্ত অঞ্চলের অন্তত ছয়টি বড় জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জিরং স্থলবন্দর এলাকার অবকাঠামোও। নদীর গতিপথ ও পানিপ্রবাহের পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে ভাটির বিস্তীর্ণ এলাকায়।

অর্থাৎ পাহাড়ের ওপরের একটি ধসের অভিঘাত শুধু পাহাড়েই আটকে থাকেনি। এর প্রভাব পৌঁছেছে বহু দূরের জনপদ ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোতেও।

জলবায়ু পরিবর্তন কি সরাসরি এই বিপর্যয় ঘটিয়েছে?

এখানেই বিজ্ঞানীদের বক্তব্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো একটি নির্দিষ্ট হিমবাহ ধস বা বন্যার জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে সব সময় সহজ নয়। কারণ পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিকম্প, ভারী বৃষ্টি, ভূতাত্ত্বিক গঠন, বরফ গলা, নদীর প্রবাহ—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এসব ঘটনার ঝুঁকি ও তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে

তাপমাত্রা বাড়লে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের বরফ ও তুষার দ্রুত গলতে শুরু করে। পাহাড়ের ফাটল ও পাথরের মধ্যে জমে থাকা বরফ গলে গেলে অনেক ক্ষেত্রে সেই বরফের তৈরি প্রাকৃতিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল থাকা পাথরের স্তরও ধীরে ধীরে নড়বড়ে হয়ে পড়তে পারে।

একই সঙ্গে পরিবর্তিত বৃষ্টিপাতের ধরন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। কোথাও দীর্ঘ খরা, আবার কোথাও স্বল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টি পাহাড়ি ঢালের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

ফলে একটি দুর্যোগের পেছনে আর একক কোনো কারণ কাজ করছে না। তৈরি হচ্ছে ‘ক্যাসকেডিং রিস্ক’—অর্থাৎ একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনাকে জন্ম দিচ্ছে।

হিমালয় এখন একটি পরিবর্তনশীল বিপদাঞ্চল

হিমালয়কে অনেক সময় পৃথিবীর ‘তৃতীয় মেরু’ বলা হয়। কারণ মেরু অঞ্চলের বাইরে এখানেই বিপুল পরিমাণ বরফ ও হিমবাহ রয়েছে। এ অঞ্চলের নদীগুলো দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু এই বরফের জগৎ দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ শুধু হিমবাহ গলে যাওয়াকে ঘিরে নয়। বরং হিমবাহ গলার ফলে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা, নতুন হিমবাহ হ্রদ তৈরি, আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস এবং নদীর প্রবাহ—সবকিছুতেই পরিবর্তন আসছে।

এ কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেপাল, ভারত, ভুটান ও তিব্বতের বিভিন্ন এলাকায় হিমবাহ-সম্পর্কিত বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা বাড়তে দেখা যাচ্ছে।

২০২৫ সালে তিব্বত-নেপাল সীমান্তের জিরং এলাকায় বন্যা, ২০২৪ সালে নেপালের থামে গ্রামে হিমবাহ হ্রদ-সংক্রান্ত বিপর্যয় এবং ২০২৩ সালে ভারতের সিকিমে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা—সব ঘটনাই হিমালয় অঞ্চলের নতুন বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে।

প্রতিটি ঘটনার কারণ এক নয়। কিন্তু একটি সাধারণ বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—পাহাড়ের পরিবেশ এখন আগের চেয়ে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।

বিপদ শুধু পাহাড়ের মানুষের নয়

পাহাড়ে একটি হিমবাহ ধসে পড়লে প্রথম আঘাতটা অবশ্যই স্থানীয় মানুষের ওপর আসে। একটি গ্রাম কয়েক মিনিটের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। সেতু, রাস্তা, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা পর্যটন অবকাঠামো ভেসে যেতে পারে।

কিন্তু এর প্রভাব পাহাড়ের সীমানায় আটকে থাকে না।

হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদীগুলো বহু দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে উজানের পরিবেশগত পরিবর্তন ভাটির দেশগুলোর পানিসম্পদ, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বন্যা পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশের মানুষের কাছে হিমালয়ের বরফ গলা হয়তো দূরের কোনো ঘটনা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু উজানের নদী, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং জলপ্রবাহের পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিবেশ ও নদীব্যবস্থার সম্পর্ক গভীর।

তাই হিমালয়ের সংকট আসলে শুধু নেপালের বা তিব্বতের সংকট নয়; এটি পুরো অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু ও নিরাপত্তা প্রশ্নের অংশ।

উন্নয়নও কি নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে?

প্রাকৃতিক দুর্যোগের আলোচনা করতে গিয়ে আরেকটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণ।

হিমালয়ের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক দশকে সড়ক, পর্যটনকেন্দ্র, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং সীমান্ত বাণিজ্য অবকাঠামো দ্রুত বেড়েছে। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দ্রুত পরিবর্তনশীল ও ভূতাত্ত্বিকভাবে সংবেদনশীল পাহাড়ি অঞ্চলে এসব প্রকল্পের ঝুঁকি মূল্যায়ন কতটা দীর্ঘমেয়াদি?

একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পাহাড়ের ওপরে হিমবাহ ধস বা আকস্মিক বন্যা দেখা দিলে সেই অবকাঠামো মুহূর্তেই বিপদের মুখে পড়তে পারে।

তাই শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়, পরিকল্পনা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে।

গত শতকের তথ্য ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা অবকাঠামো পরিকল্পনা হয়তো আগামী কয়েক দশকের পরিবর্তিত হিমালয়ের জন্য যথেষ্ট হবে না।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আমরা কি আগাম সতর্ক হতে পারছি?

প্রযুক্তির অগ্রগতির যুগে পাহাড়ি দুর্যোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে আগাম সতর্কতা।

স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, হিমবাহ ও পাহাড়ি ঢালের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, সেন্সরভিত্তিক সতর্কতা ব্যবস্থা এবং নদীর পানিপ্রবাহ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিত করা সম্ভব।

কিন্তু প্রযুক্তি থাকলেই সমাধান হয় না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেই তথ্য দ্রুত স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছানো। একটি দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে বসবাসকারী মানুষ যদি কয়েক মিনিট আগে সতর্কবার্তা পান, তাহলে হয়তো শত শত জীবন রক্ষা করা সম্ভব।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আসল পরীক্ষা তাই শুধু বিপর্যয়ের পর উদ্ধারকাজে নয়; বরং বিপর্যয়ের আগেই কতটা প্রস্তুত থাকা গেছে, সেটিতেও।

পাহাড়ের নীরব পরিবর্তন এখন আর নীরব নেই

হিমালয়ের বরফ গলা, পাথরের ভিত দুর্বল হওয়া কিংবা নতুন হিমবাহ হ্রদ তৈরি—এসব পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটছে। কিন্তু এর ফল কখনো কখনো আসে হঠাৎ করে, কয়েক মিনিটের মধ্যে।

একটি শান্ত পাহাড়ি নদী আচমকা ধ্বংসের স্রোতে পরিণত হয়। একটি পর্যটন এলাকা পরিণত হয় উদ্ধার অভিযানের কেন্দ্রে। যে মানুষ সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন, সন্ধ্যার মধ্যে তাঁর পুরো জনপদ হয়তো আর আগের মতো থাকে না।

নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের সাম্প্রতিক বিপর্যয় তাই শুধু মৃত্যুর সংখ্যা বা ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর হিসাব নয়। এর পেছনে রয়েছে পাহাড়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের পরিবর্তিত এক গল্প।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন হয়তো একা এই দুর্যোগ ঘটায়নি। কিন্তু উষ্ণ পৃথিবী পাহাড়কে এমন এক নতুন বাস্তবতায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বরফের বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, ঢাল অস্থিতিশীল হচ্ছে এবং একটির পর একটি দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

হিমালয়ের মতো অঞ্চলের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—জলবায়ু পরিবর্তনকে ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা হিসেবে না দেখে বর্তমানের বাস্তব ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা।

কারণ পাহাড় যখন ধসে পড়ে, তখন শুধু পাথর ও বরফই নিচে নামে না; ভেসে যায় মানুষের ঘর, জীবিকা, স্মৃতি এবং বহু বছরের গড়ে ওঠা একটি জনপদের ভবিষ্যৎ।

হিমালয়ের এই সতর্কবার্তা তাই শুধু পাহাড়ের জন্য নয়—পানি, প্রকৃতি ও জলবায়ুর সঙ্গে যুক্ত পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য।