প্রযুক্তি ডেস্ক

আজকের পৃথিবীতে সকাল শুরু থেকে রাতের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইন্টারনেট। খবর পড়া, প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলা, অফিসের কাজ, ব্যাংকিং, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা বিনোদন—সবকিছুরই বড় একটি অংশ এখন ডিজিটাল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই বিপ্লবের শুরু হয়েছিল একটি অপেক্ষাকৃত সাধারণ ধারণা থেকে—কম্পিউটারে থাকা তথ্য কীভাবে সহজে একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করা যায়।

এই ইতিহাসকে স্মরণ করেই প্রতিবছর ২৩ আগস্ট বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট দিবস হিসেবে পালিত হয়। দিনটি মূলত ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব বা WWW-এর উন্মুক্ত হওয়ার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—ইন্টারনেট ও ওয়েব এক জিনিস নয়। ইন্টারনেট হলো বিশ্বজুড়ে কম্পিউটার নেটওয়ার্কগুলোর অবকাঠামো, আর ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব হলো সেই অবকাঠামোর ওপর তথ্য, ওয়েবসাইট ও হাইপারলিংকের মাধ্যমে মানুষের ব্যবহারের একটি ব্যবস্থা।

সার্ন থেকে শুরু, পৃথিবীজুড়ে বিস্তার

ব্রিটিশ কম্পিউটার বিজ্ঞানী টিম বার্নার্স-লি ১৯৮৯ সালে সুইজারল্যান্ডের ইউরোপীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সার্নে কাজ করার সময় একটি নতুন তথ্যব্যবস্থার ধারণা দেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল গবেষকদের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তথ্য ও নথিগুলোকে এমনভাবে যুক্ত করা, যাতে সহজেই এক তথ্য থেকে আরেক তথ্যে যাওয়া যায়।

এই ধারণা থেকেই জন্ম নেয় ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব

পরবর্তী সময়ে ওয়েবের জন্য তৈরি হয় তিনটি মৌলিক প্রযুক্তি—HTML, HTTP এবং URL। এই তিনটি উপাদানই মূলত আজকের ওয়েবভিত্তিক বিশ্বের ভিত্তি গড়ে দেয়। ওয়েবসাইট, ওয়েব ব্রাউজার এবং হাইপারলিংকের যে জগৎকে আমরা আজ স্বাভাবিক বলে ধরে নিই, তার শুরু সেই সময়ের এই উদ্ভাবন থেকেই।

বার্নার্স-লির তৈরি প্রথম ওয়েবসাইটটি ছিল অত্যন্ত সাধারণ। সেখানে ওয়েব কী, কীভাবে এটি ব্যবহার করতে হবে এবং কীভাবে নতুন ওয়েবপেজ তৈরি করা যায়—এসব তথ্য দেওয়া হয়েছিল। প্রযুক্তির ইতিহাসে সেই সাধারণ ওয়েবপেজই আজ এক বিশাল ডিজিটাল সভ্যতার প্রতীক।

ইন্টারনেট ছিল আগে, কিন্তু ওয়েব বদলে দেয় ব্যবহার

ইন্টারনেটের ধারণা ও প্রযুক্তিগত বিকাশ শুরু হয়েছিল ওয়েবের অনেক আগে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ককে যুক্ত করার জন্য ইন্টারনেট প্রটোকল তৈরি হয়েছিল ধাপে ধাপে।

কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য প্রযুক্তিটিকে সহজলভ্য করে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে ওয়েব।

আগে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক মূলত গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশেষজ্ঞদের ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ওয়েব সেই জটিল ব্যবস্থাকে মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী করে তোলে। একটি লিংকে ক্লিক করে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের তথ্য দেখার যে অভিজ্ঞতা আজ আমাদের কাছে স্বাভাবিক, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সেটিই ছিল এক বিপ্লবী ধারণা।

আর সেই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—তথ্যকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া

১৯৯৩ সালে সার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও উন্মুক্ত নীতি গ্রহণ করে। ফলে কোনো একটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ না থেকে ওয়েব দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। আজকের ডিজিটাল অর্থনীতি, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-কমার্স—সবকিছুর পেছনেই সেই সিদ্ধান্তের দীর্ঘ প্রভাব রয়েছে।

সার্চ ইঞ্জিন থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

ওয়েব জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসে নতুন একটি সমস্যা—তথ্যের বিশাল সমুদ্রে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাওয়া।

শুরুর দিকের সার্চ টুলগুলোর মধ্যে ছিল Archie, যা ১৯৯০ সালে চালু হয়। পরে ইয়াহু, অল্টাভিস্তা, লাইকোসসহ বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন জনপ্রিয় হয়। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে Google-এর উত্থান তথ্য খোঁজার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনে।

একইভাবে মানুষের সামাজিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করতে শুরু করে। SixDegrees.com, Friendster এবং MySpace-এর মতো প্ল্যাটফর্মের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন যুগ তৈরি করে Facebook।

এরপরের ইতিহাস আরও দ্রুতগতির।

ভিডিওর জন্য YouTube, ক্ষুদ্র বার্তার জন্য Twitter বা বর্তমানের X, ছবি ও ভিজ্যুয়াল যোগাযোগের জন্য Instagram, আর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম—প্রতিটি নতুন প্রযুক্তি মানুষের যোগাযোগের ধরন বদলে দিয়েছে।

ব্রাউজারের যুদ্ধ, বদলে যাওয়া প্রযুক্তির মানচিত্র

ওয়েবের শুরুর যুগে Mosaic ও Netscape Navigator ছিল আলোচিত নাম। পরবর্তী সময়ে Microsoft-এর Internet Explorer দীর্ঘ সময় ব্রাউজার বাজারে প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখে।

কিন্তু প্রযুক্তির জগতে স্থায়ী আধিপত্য বলে কিছু নেই।

নতুন প্রতিযোগিতা, দ্রুতগতির ব্রাউজিং, নিরাপত্তা এবং মোবাইল ইন্টারনেটের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাউজারের বাজারও বদলে যায়। বর্তমানে Google Chrome বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ব্রাউজার। এর পাশাপাশি Apple-এর Safari, Microsoft Edge এবং Mozilla Firefox নিজেদের ব্যবহারকারী ধরে রেখেছে।

এই পরিবর্তন আসলে ইন্টারনেটের ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা দেয়—প্রযুক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারলে পিছিয়ে পড়তে পারে।

ইন্টারনেট শুধু প্রযুক্তি নয়, এখন একটি সামাজিক বাস্তবতা

ইন্টারনেটের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত প্রযুক্তিগত নয়, সামাজিক।

একসময় একটি খবর মানুষের কাছে পৌঁছাতে পরের দিনের সংবাদপত্রের অপেক্ষা করতে হতো। এখন একটি ঘটনা ঘটার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেটি বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

একজন শিক্ষার্থী পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন কোর্সে অংশ নিতে পারেন। ছোট একটি ব্যবসা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারে। গ্রামের একজন উদ্যোক্তা মোবাইল ফোন থেকেই পণ্য বিক্রি করতে পারেন। প্রবাসে থাকা পরিবারের সদস্য ভিডিও কলে মুহূর্তের মধ্যে প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ইন্টারনেট শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির একটি বড় সুযোগ।

তবে বিপ্লবের সঙ্গে এসেছে নতুন সংকটও

ইন্টারনেটের গল্প কেবল সম্ভাবনার গল্প নয়। এর একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে।

ভুয়া তথ্য, গুজব, সাইবার অপরাধ, অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি—ডিজিটাল জীবনের এসব চ্যালেঞ্জ এখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের বিষয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—ভবিষ্যতে কোন তথ্য সত্য, কোনটি কৃত্রিমভাবে তৈরি, তা মানুষ কীভাবে নির্ধারণ করবে?

একদিকে ইন্টারনেট তথ্যকে গণতান্ত্রিক করেছে, অন্যদিকে ভুল তথ্য ছড়ানোর সুযোগও বাড়িয়েছে। একদিকে এটি মানুষকে কাছাকাছি এনেছে, অন্যদিকে অনেকের বাস্তব সামাজিক সম্পর্ককে দুর্বলও করেছে।

তাই ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তি কত দ্রুত এগোয়, তার ওপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে আমরা প্রযুক্তিকে কতটা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে পারি তার ওপরও।

এক ওয়েবপেজ থেকে ডিজিটাল সভ্যতা

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে একটি ছোট গবেষণা প্রকল্প থেকে শুরু হওয়া ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব আজ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী যোগাযোগব্যবস্থাগুলোর একটি।

সেই সময় হয়তো খুব কম মানুষই ভাবতে পেরেছিলেন, একদিন একটি মোবাইল ফোনের ভেতর থাকবে সংবাদপত্র, ব্যাংক, বাজার, সিনেমা হল, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস এবং পৃথিবীর কোটি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ।

২৩ আগস্টের ইন্টারনেট দিবস তাই শুধু একটি প্রযুক্তির জন্মদিন স্মরণ করার উপলক্ষ নয়। এটি মানবসভ্যতার যোগাযোগের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের কথাও মনে করিয়ে দেয়।

একসময় মানুষ তথ্য খুঁজতে লাইব্রেরির তাক ঘুরেছে। আজ একটি সার্চ বক্সে কয়েকটি শব্দ লিখলেই খুলে যায় বিশাল এক তথ্যভান্ডার। একসময় দূরত্ব মানে ছিল অপেক্ষা; আজ পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষও একটি ভিডিও কলে চোখের সামনে হাজির।

তবে এই অসাধারণ শক্তির সঙ্গে আমাদের দায়িত্বও বাড়ছে।

ইন্টারনেটকে শুধু দ্রুততর নয়, আরও নিরাপদ, সত্যনির্ভর, মানবিক এবং সবার জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য করে তোলাই হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কারণ, ইন্টারনেটের প্রকৃত সাফল্য শুধু কত কোটি মানুষ অনলাইনে আছে, সেই সংখ্যায় নয়; বরং এই প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে কতটা জ্ঞানভিত্তিক, নিরাপদ এবং মানবিক করে তুলতে পারছে—তার মধ্যেই নিহিত।