‘নতুন বাংলাদেশ’ কতটা নতুন—জবাবদিহি, বিচার, জ্বালানি, শ্রম, শিক্ষা ও পরিবেশ নিয়ে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মটির অবস্থান
নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকার পরিবর্তন হলেই কি রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যায়? নাকি একটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে সংস্কার না করলে পুরোনো ব্যবস্থাই নতুন নামে ফিরে আসতে পারে?
এই প্রশ্নকে সামনে রেখেই দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে নবগঠিত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘অল্টারনেটিভস’।
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীতে ‘দেশের অবস্থা’ শিরোনামে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্ল্যাটফর্মটির জাতীয় সাংগঠনিক কমিটির পক্ষ থেকে নয় দফা দাবি তুলে ধরেন সংগঠক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।
দাবিগুলোর পরিধি কেবল রাজনৈতিক সংস্কারে সীমাবদ্ধ নয়। সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামো থেকে শুরু করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচার, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার জবাবদিহি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি, স্বাস্থ্যসেবা, নারী ও সাংস্কৃতিক অধিকার, শ্রমিকের অধিকার, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ—রাষ্ট্র পরিচালনার প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে এই ৯ দফার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য সম্ভবত অন্য জায়গায়—‘সরকার পরিবর্তন’কে তারা ‘ব্যবস্থা পরিবর্তন’-এর সমার্থক হিসেবে দেখতে রাজি নয়।
জুলাইয়ের পরও কেন ‘নতুন বাংলাদেশ’ হয়নি?
সংবাদ সম্মেলনে অল্টারনেটিভসের পক্ষ থেকে বলা হয়, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের সাহসী আন্দোলনের পরও প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাদের মূল্যায়ন, সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর অনেক উপাদান এখনো বহাল রয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা নতুন রাজনৈতিক মোড়কে ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
এটি নিঃসন্দেহে একটি কঠোর রাজনৈতিক মূল্যায়ন।
তবে এর ভেতরে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি ব্যক্তি বা সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলায়, নাকি তাদের কাঠামো, নিয়োগব্যবস্থা, জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানো প্রয়োজন?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহির প্রশ্ন কোনো একটি সরকারের সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে অল্টারনেটিভসের রাষ্ট্রকাঠামোগত সংস্কারের দাবি সেই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
কিন্তু এখানেই তাদের সামনে প্রথম বড় পরীক্ষা—‘সংস্কার’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে এবং কোন প্রতিষ্ঠান কীভাবে বদলানো হবে, তার একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা কত দ্রুত তারা দিতে পারে।
বিচার: জুলাইয়ের বাইরে আরও দীর্ঘ তালিকা
নয় দফার দ্বিতীয় ও তৃতীয় দাবিতে বিচার ও জবাবদিহির বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে প্ল্যাটফর্মটি। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের বিচার এবং আন্দোলনে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অংশগ্রহণকারীদের স্বীকৃতির কথাও বলা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অল্টারনেটিভস বিচারকে কেবল জুলাইয়ের ঘটনাবলির মধ্যে আটকে রাখতে চাইছে না। তারা গত দেড় দশকের মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি বৃহত্তর হিসাব সামনে আনার কথা বলছে।
এমন তালিকা তৈরি অবশ্য সহজ কাজ নয়। অভিযোগ যাচাই, তথ্য সংগ্রহ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্যের নিষ্পত্তি এবং প্রত্যেক ঘটনার জন্য প্রমাণভিত্তিক তদন্ত—সবই প্রয়োজন হবে।
অর্থাৎ রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে এটি বাস্তবায়ন করতে হলে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত কাঠামো প্রয়োজন।

জ্বালানি নীতিতে ‘সার্বভৌমত্ব’—দাবিটির অর্থ কতটা গভীর?
নয় দফায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানের পাশাপাশি কুইক রেন্টাল এবং অসম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে আমদানি, বিদেশি কোম্পানি এবং অলিগার্ক-নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটিয়ে ‘জ্বালানি সার্বভৌমত্ব’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
এই দাবির রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ জ্বালানি খাত শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি শিল্প, কৃষি, পরিবহন, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তবে এখানে আবেগের পাশাপাশি বাস্তব অর্থনীতির হিসাবও জরুরি।
বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল জ্বালানি চাহিদা মেটাতে একদিকে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারও প্রয়োজন। কিন্তু সেই রূপান্তর করতে বিনিয়োগ, গ্রিড অবকাঠামো, প্রযুক্তি, সঞ্চয়ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি দরকার।
তাই ‘জ্বালানি সার্বভৌমত্ব’ একটি আকর্ষণীয় রাজনৈতিক ধারণা হলেও সেটিকে বাস্তব নীতিতে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট রোডম্যাপ।
স্বাস্থ্য: রোগীর অধিকার বনাম চিকিৎসকদের নিরাপত্তা
অল্টারনেটিভসের দাবিতে স্বাস্থ্য খাতের দুটি বিষয় বিশেষভাবে উঠে এসেছে—স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা এবং রোগীর সুরক্ষা ও প্রতিকার।
‘স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ এবং ‘রোগী সুরক্ষা ও প্রতিকার অধ্যাদেশ-২০২৫’-কে আইনে পরিণত করার দাবি জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্কের সংকট দীর্ঘদিনের। চিকিৎসকদের ওপর হামলা যেমন বাস্তব সমস্যা, তেমনি চিকিৎসায় অবহেলা, অতিরিক্ত ব্যয়, ভুল চিকিৎসা কিংবা রোগীর অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা না থাকার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি কার্যকর স্বাস্থ্যনীতি তাই কেবল চিকিৎসককে নিরাপত্তা দেবে না; একই সঙ্গে রোগীকেও ন্যায়সংগত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
এই ভারসাম্যই প্রস্তাবিত আইনগুলোর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে।
নারী, সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের জায়গা
নয় দফায় নারী কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, যৌন ও শিশু নিপীড়ন প্রতিরোধের পাশাপাশি ভিন্নমত ও বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ’ মোকাবিলার কথাটিও বলা হয়েছে।
তবে এই শব্দবন্ধটি রাজনৈতিকভাবে বিতর্ক তৈরি করতে পারে। কারণ ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ’ বলতে ঠিক কোন ধরনের কর্মকাণ্ড, প্রতিষ্ঠান বা প্রবণতাকে বোঝানো হচ্ছে—তার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকলে এটি আবারও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
অল্টারনেটিভস যদি সত্যিই বহুত্ববাদী সংস্কৃতির পক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে সেই বহুত্ববাদ নিজেদের রাজনৈতিক মতের বাইরের মতের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
অর্থাৎ যে মতকে আমরা অপছন্দ করি, তার প্রকাশের অধিকারও রক্ষা করতে পারা—বহুত্ববাদের আসল পরীক্ষা সেখানেই।
শ্রমিক ও কৃষকের প্রশ্নে অর্থনৈতিক বাস্তবতা
শ্রম কমিশনের সুপারিশ এবং শ্রম আইন ২০২৬ বাস্তবায়ন, বন্ধ কলকারখানা চালু করা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনঃকর্মসংস্থানের দাবি করেছে সংগঠনটি।
সরকারি পাটকল, চিনিকল ও অন্যান্য কারখানা বেসরকারি খাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে শ্রমিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের শিল্পনীতিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন লোকসানি প্রতিষ্ঠান চালু রাখা যেমন অর্থনৈতিকভাবে কঠিন, তেমনি কেবল বেসরকারীকরণের মাধ্যমে দায় এড়িয়ে যাওয়াও শ্রমিক ও স্থানীয় অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তাই ‘কারখানা চালু’ করার দাবির সঙ্গে প্রশ্ন আসবে—কীভাবে তা লাভজনক করা হবে, কার বিনিয়োগে, কী প্রযুক্তিতে এবং শ্রমিকদের অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে?
কৃষি খাতের সার সংকট সমাধান এবং কৃষকদের দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের দাবিও একইভাবে সামাজিক নিরাপত্তার বৃহত্তর প্রশ্নকে সামনে আনে।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান: তরুণদের ভবিষ্যৎ কোথায়?
স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর দাবি জানিয়েছে অল্টারনেটিভস।
পাশাপাশি ছাত্র ও যুবসমাজের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা পৃষ্ঠপোষকতা এবং দলীয় পক্ষপাতমুক্ত নিয়োগব্যবস্থার দাবি করা হয়েছে।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য এটি সম্ভবত সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রশ্নগুলোর একটি।
শিক্ষা শেষ করে কর্মসংস্থান না পাওয়া শুধু ব্যক্তিগত হতাশা তৈরি করে না; এটি দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা, দক্ষ মানবসম্পদের অপচয় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতে নিরাপদ ও জেন্ডার-সংবেদনশীল কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও চাকরির নিরাপত্তার দাবি দেখাচ্ছে—প্ল্যাটফর্মটি কর্মসংস্থানকে শুধু ‘চাকরি পাওয়া’ হিসেবে দেখছে না; কর্মক্ষেত্রের মর্যাদা ও অধিকারকেও এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
পরিবেশ: উন্নয়ন বনাম প্রকৃতির পুরোনো দ্বন্দ্ব
নয় দফার শেষ দাবিটি পরিবেশকে কেন্দ্র করে।
প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসকারী উন্নয়ন প্রকল্প বাতিল এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে জলবায়ু-সহনশীল প্রকল্প গ্রহণের দাবি করা হয়েছে। বন্যা, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত মানুষদের পুনর্বাসনের কথাও বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে এই প্রশ্ন আর কেবল পরিবেশবাদীদের বিষয় নয়। এটি মানুষের বসতি, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, অভিবাসন এবং নগরায়ণের সঙ্গেও যুক্ত।
তবে এখানেও ‘পরিবেশের স্বার্থে উন্নয়ন বন্ধ’—এমন সরল সমীকরণ কার্যকর নয়।
প্রয়োজন উন্নয়নের ধরন, স্থান, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং সামাজিক লাভ-ক্ষতির বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দাবি থেকে নীতিতে যাত্রা
অল্টারনেটিভসের নয় দফা নিঃসন্দেহে বিস্তৃত। এতে রাষ্ট্রীয় সংস্কার থেকে শুরু করে একজন শ্রমিক, রোগী, কৃষক, শিক্ষার্থী কিংবা জলবায়ু-দুর্গত মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতার প্রশ্ন উঠে এসেছে।
কিন্তু একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের জন্য দাবি তোলা তুলনামূলকভাবে সহজ; কঠিন হলো সেই দাবির বাস্তবায়নযোগ্য নকশা তৈরি করা।
উদাহরণ হিসেবে রাষ্ট্রীয় সংস্কার কীভাবে হবে?
কোন সাংবিধানিক ধারা পরিবর্তন করা হবে?
জুলাইয়ের বিচার কোন আইনি কাঠামোয় এবং কোন আদালতে হবে?
জ্বালানি আমদানি কমানোর বিকল্প কী?
লোকসানি শিল্পপ্রতিষ্ঠান কীভাবে টেকসই করা হবে?
শিক্ষা কমিশনের স্বাধীনতা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
আর পরিবেশবিরোধী প্রকল্প চিহ্নিত করার মানদণ্ডই বা কী হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া নয় দফা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র হতে পারে, কিন্তু এখনো পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় নীতির বিকল্প নয়।
‘প্রতিরোধের প্রস্তুতি’—গণতন্ত্রের জন্য সতর্কতার জায়গা
সংবাদ সম্মেলনে স্বাধীনভাবে কথা বলা, সংগঠিত হওয়া ও প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনে ‘প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত থাকার’ আহ্বানও জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে এই বক্তব্যের তাৎপর্য রয়েছে। তবে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে প্রতিবাদের অধিকার যেমন মৌলিক, তেমনি সেই প্রতিবাদকে শান্তিপূর্ণ, সাংবিধানিক ও মানুষের নিরাপত্তার প্রতি দায়বদ্ধ রাখার দায়িত্বও রাজনৈতিক শক্তির।
একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের গ্রহণযোগ্যতা শুধু তার সরকারের সমালোচনায় নয়; বরং ক্ষমতায় গেলে সে নিজে কতটা জবাবদিহিমূলক থাকবে, বিরোধী মতকে কতটা জায়গা দেবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কতটা স্বাধীন রাখবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে যে পরীক্ষাটি
অল্টারনেটিভসের নয় দফা মূলত একটি রাজনৈতিক সতর্কবার্তা—জুলাইয়ের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে শুধু ক্ষমতার পালাবদলে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।
এই বার্তার সঙ্গে একমত হওয়া বা না হওয়া রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন বিষয়। কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কার, বিচার, জ্বালানি নিরাপত্তা, শ্রমিকের অধিকার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পরিবেশের প্রশ্নগুলোকে একসঙ্গে আলোচনায় আনা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এখন দেখার বিষয়, অল্টারনেটিভস তাদের ঘোষিত দাবিগুলোকে কীভাবে বিস্তারিত নীতিপত্র, সময়সীমা, অর্থনৈতিক হিসাব এবং বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাবে রূপ দেয়।
কারণ জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা শুধু নতুন স্লোগান নয়—তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায় যেখানে সরকার বদলালেই রাষ্ট্রের পুরোনো অসুখগুলো নতুন নামে ফিরে আসবে না।
সেই জায়গায় অল্টারনেটিভসের নয় দফা একটি রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি একটি বড় প্রশ্নও ছুড়ে দিয়েছে—
আমরা কি শুধু নতুন শাসক চাই, নাকি সত্যিই নতুন রাষ্ট্র চাই?
