কলাম
মোহাম্মদ আশরাফুল বাংলাদেশের নতুন ব্যাটিং কোচ হয়েছেন—এই খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখছি।
কেউ বলছেন, ভালো খেলোয়াড় হলেই ভালো কোচ হওয়া যায় না।
কেউ বলছেন, যার নিজের ক্যারিয়ারই ধারাবাহিক ছিল না, তিনি কীভাবে জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ হবেন?
কেউ তাঁর অতীতের দুর্নীতি ও ফিক্সিং কেলেঙ্কারির কথা সামনে আনছেন।
এসব প্রশ্নের কোনোটিতেই আমার আপত্তি নেই।
আশরাফুল ভালো কোচ হবেন কি না সেটা সময়ই বলবে। একজন অসাধারণ ব্যাটার যে অসাধারণ কোচ হবেন, এমন কোনো নিয়ম ক্রিকেটে নেই। আবার একজন বিতর্কিত ক্রিকেটারও ভবিষ্যতে ভালো কোচ হতে পারেন সেটিও অসম্ভব নয়।
কিন্তু আমার আপত্তি অন্য জায়গায়।
যখন আশরাফুলের ব্যাটিং প্রতিভা, তাঁর ক্রিকেটীয় শ্রেষ্ঠত্ব এবং বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে তাঁর জায়গা নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়, তখন মনে হয় আমরা আমাদের নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসটাই ভুলে যাচ্ছি।
কারণ, Before Shakib Al Hasan, there was Mohammad Ashraful.
বাংলাদেশের প্রথম সুপারস্টার।
প্রথম সত্যিকারের ম্যাচ উইনার।
প্রথম বিশ্বমঞ্চের আলো কেড়ে নেওয়া ব্যাটার।
এবং সম্ভবত বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে ‘অসম্ভব’কে সম্ভব করে ফেলার ক্ষমতা থাকা ব্যাটসম্যান।
আর একটা নাম ‘আশার ফুল’।
আশরাফুলকে বোঝার আগে সময়টাকে বুঝুন
আজকের ক্রিকেটের দর্শকের জন্য আশরাফুলকে বোঝা কঠিন।
কারণ আজ বাংলাদেশ ক্রিকেটে জয়ের প্রত্যাশা স্বাভাবিক। আমরা সিরিজ জিততে চাই, বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নিয়ে আলোচনা করি, বড় দলের বিপক্ষে জিতলে সেটাকে অঘটন নয়, সম্ভাব্য ফল হিসেবে দেখি।
২০০০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশের ক্রিকেট এমন ছিল না।
তখন ৫০ ওভারের ম্যাচে বাংলাদেশ ৩০ ওভার পর্যন্ত টিকে থাকবে কি না এটাই ছিল প্রশ্ন।
বড় দলের বিপক্ষে জয়ের স্বপ্ন দেখার আগে আমরা ভাবতাম, হয়তো আজ একটু সম্মানজনকভাবে হারব।
সেই সময়ে একজন কিশোর এসে ব্যাট হাতে এমন কিছু করতে শুরু করলেন, যা বাংলাদেশের ক্রিকেটে আগে খুব কমই দেখা গিয়েছিল।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক।
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ অলআউট ৯০।
দ্বিতীয় ইনিংসে ৮১ রানে চার উইকেট পড়ে গেছে।
১৭ বছর বয়সী ছেলেটি ব্যাট করতে নামলেন।
তারপর ১১৪।
মোহাম্মদ আশরাফুল তখন মাত্র ১৭ বছর ৬১ দিনের। তিনি টেস্ট অভিষেকেই সেঞ্চুরি করেন এবং সেই সময় টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান হন। (Guinness World Records)
এটা শুধু বাংলাদেশের জন্য বড় ঘটনা ছিল না।
এটা ছিল বিশ্ব ক্রিকেটের জন্যও খবর।
সচিন টেন্ডুলকারের মতো নামের সঙ্গে একই বয়সের তালিকায় উঠে এসেছিলেন বাংলাদেশের এক কিশোর।
সেখান থেকেই শুরু।

কার্ডিফ- শুধু একটি ম্যাচ নয়
২০০৫ সালের ১৮ জুন।
কার্ডিফ।
প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া।
রেকি পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, ড্যামিয়েন মার্টিন, মাইকেল ক্লার্ক, গ্লেন ম্যাকগ্রা, জেসন গিলেস্পি- সেই সময়ের অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে ভয়ংকর দলগুলোর একটি।
বাংলাদেশ তখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
অস্ট্রেলিয়া করল ২৪৯। বাংলাদেশের সামনে ২৫০।
আজকের দর্শকের কাছে সংখ্যাটি খুব স্বাভাবিক। তখন এটি ছিল প্রায় অসম্ভব। আর সেই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন আশরাফুল।
১০১ বলে ১০০।
বাংলাদেশ জিতল পাঁচ উইকেটে।
এটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম জয়। আশরাফুল হলেন ম্যাচসেরা। (Trinidad and Tobago Newsday)
তাঁর সেঞ্চুরিটি এসেছিল ১০০ বলেই; পরে স্কোরকার্ডে ইনিংসটি ১০১ বলে ১০০ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। (IMG Cricket)
একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। ওটা কোনো দুর্বল অস্ট্রেলিয়া ছিল না। সেই দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ জিতেছিল। আর সেই জয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন একজন ২১ বছর বয়সী ব্যাটার।
এই কারণেই কার্ডিফ শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়।
এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের মানসিকতার পরিবর্তনের মুহূর্ত।
তারপর ইংল্যান্ড
কার্ডিফের সেই সিরিজেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আশরাফুল খেললেন আরেকটি অবিশ্বাস্য ইনিংস।
৫১ বলে ৯৪।
সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ছয় রান দূরে থামতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু ৫১ বলে ৯৪, সেই সময়ের বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন ব্যাটিং ছিল প্রায় অকল্পনীয়। এখানেই আশরাফুলের বিশেষত্ব। তিনি শুধু রান করতেন না। তিনি এমন গতিতে রান করতেন, এমন শট খেলতেন এবং এমন পরিস্থিতিতে খেলতেন, যা বাংলাদেশের ব্যাটিং সংস্কৃতিতে তখন প্রায় অপরিচিত ছিল।
দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের মঞ্চে
২০০৭ বিশ্বকাপ।
বাংলাদেশ তখন ভারতের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস পেয়েছে। সুপার এইটে সামনে দক্ষিণ আফ্রিকা। দক্ষিণ আফ্রিকা তখন ওয়ানডে ক্রিকেটের এক নম্বর দল। বাংলাদেশ শুরুতেই বিপদে। ৮৪ রানে চার উইকেট। এরপর আশরাফুল।
৮৩ বলে ৮৭ রান। ১২টি চার। ইনিংসটির সবচেয়ে বড় মূল্য শুধু রানসংখ্যায় নয় পরিস্থিতিতে।
বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ২৫১/৮ করল। দক্ষিণ আফ্রিকা অলআউট ১৮৪। বাংলাদেশ জিতল ৬৭ রানে। আশরাফুল হলেন ম্যাচসেরা।
এমন ম্যাচই তৈরি করেছিল ‘ক্লাচ প্লেয়ার’ আশরাফুলের পরিচয়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ টি-টোয়েন্টির প্রথম বিশ্বকাপ
তারপর ২০০৭ সালের প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। প্রথম ম্যাচ। প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বাংলাদেশের সামনে ১৬৫ রানের লক্ষ্য।
আশরাফুল করলেন- ২৭ বলে ৬১ অপরাজিত।
বাংলাদেশ জিতল ছয় উইকেটে।
আইসিসির ম্যাচের বিবরণ অনুযায়ী, সেই ইনিংসে তাঁর ২৭ বলে ৬১* ছিল বাংলাদেশের হয়ে দীর্ঘদিনের দ্রুততম টি-টোয়েন্টি ফিফটির রেকর্ড ৫০ পূর্ণ করেছিলেন ২৭ বলেই।
এটাই ছিল আশরাফুল। যখন দলকে কিছু একটা অস্বাভাবিক করতে হতো, তখন তাঁর ব্যাট থেকে অস্বাভাবিক কিছু বেরিয়ে আসত।
ভারতের বিপক্ষে ২৬ বলে ফিফটি
২০০৭ সালে ভারতের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে আরও একটি উদাহরণ। আশরাফুল ৬৭ রান করেন মাত্র ৪১ বলে। ফিফটি করেন ২৬ বলে।
সেই সময়ে এটি বলের হিসাবে টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের যৌথ দ্বিতীয় দ্রুততম ফিফটি ছিল এবং সময়ের হিসাবে মাত্র ২৭ মিনিটে পঞ্চাশে পৌঁছে তিনি রেকর্ড গড়েছিলেন। এটা টেস্ট ক্রিকেট। মিরপুরের পিচে। ভারতের বিপক্ষে। ২৬ বলে।
এমন ব্যাটিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাটারদের তখনকার স্বাভাবিক খেলার কোনো মিল ছিল না।

চট্টগ্রামে ভারতের বিপক্ষে ১৫৮*
২০০৮ সালে ভারত বাংলাদেশ সফরে। চট্টগ্রাম টেস্ট।
বাংলাদেশের স্কোর ৫৪/৩। ভারতের সামনে বিশাল লিড। সেই অবস্থায় আশরাফুল খেললেন ১৫৮।*
১৯৪ বল। ২৪ চার। ৩ ছক্কা। একজন বাংলাদেশি ব্যাটার ভারতীয় বোলিংকে এমনভাবে আক্রমণ করছেন, এটিও তখন ছিল ব্যতিক্রমী দৃশ্য।
আর ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গল টেস্টে খেললেন ১৯০। এটি ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ও শেষ টেস্ট সেঞ্চুরি এবং বাংলাদেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান হওয়ার খুব কাছে গিয়ে থেমে যাওয়া একটি ইনিংস।
তাহলে কি আশরাফুল ধারাবাহিক ছিলেন?
না। এবং এই জায়গাটা লুকানোর কোনো কারণ নেই।
আশরাফুলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তির উল্টো পিঠ। তিনি ভয়ডরহীন ছিলেন। কিন্তু কখনো কখনো সেই ভয়ডরহীনতা হয়ে উঠত দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। তিনি অসাধারণ শট খেলতেন। আবার এমন শট খেলতে গিয়ে আউটও হতেন, যখন দলের প্রয়োজন ছিল আরও কিছুক্ষণ থাকা। তিনি ম্যাচ জেতাতে পারতেন।
আবার একই ম্যাচে এমন সিদ্ধান্তও নিতে পারতেন, যা দেখে দর্শক মাথায় হাত দিতেন।
তাঁর ক্যারিয়ারে ধারাবাহিকতার অভাব ছিল প্রকট। ৬১ টেস্টে তাঁর রান ২,৭৩৭, সেঞ্চুরি ৬টি; ১৭৭ ওয়ানডেতে খেলেছেন এবং ২৩ টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচও খেলেছেন। তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয় ২০১৩ সালে।
তাঁর গড় আজকের মানদণ্ডে কিংবদন্তির পর্যায়ের নয়। এবং সেটাই সত্য।
কিন্তু ব্যাটিং প্রতিভা আর ক্যারিয়ার-পরিসংখ্যান এক জিনিস নয়।
একজন ক্রিকেটার কত রান করেছেন, সেটি তাঁর ক্যারিয়ারের একটি মাপকাঠি। তিনি কী করতে পারতেন—সেটি আরেকটি।আশরাফুলের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর ছিল অসাধারণ।
আর এখানেই ‘ক্লাস’ শব্দটা গুরুত্বপূর্ণ
কেউ বলতে পারেন, ‘বিশ ম্যাচে খারাপ খেলে এক ম্যাচে ভালো করলে সেই ইনিংসের মূল্য কী?’
মূল্য আছে। কারণ ক্রিকেট কেবল গড়ের খেলা নয়। ক্রিকেট স্মৃতিরও খেলা। একটি জয় একটি প্রজন্মের মানসিকতা বদলে দিতে পারে। কার্ডিফের জয় আমাদের বিশ্বাস করিয়েছিল, বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকেও হারাতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার জয় দেখিয়েছিল, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ শুধু অংশ নিতে আসেনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি জয় দেখিয়েছিল, নতুন ফরম্যাটেও বাংলাদেশ ভয়ংকর হতে পারে। এসব মুহূর্তের মূল্য শুধু স্কোরকার্ডে মাপা যায় না।
‘ক্লাস’ বলতে আসলে কী বোঝায়?
আশরাফুলের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর শট-মেকিং। কভার ড্রাইভ। স্কয়ার কাট। পুল। হুক। ফ্লিক।
ফুটওয়ার্ক ব্যবহার করে স্পিনারদের ওপর আক্রমণ। আর সেই বিখ্যাত স্কুপ।
তিনি এমন এক সময়ে এসব শট খেলতেন, যখন বাংলাদেশের অধিকাংশ ব্যাটার নিরাপদ ক্রিকেট খেলতেই বেশি অভ্যস্ত ছিলেন।
তাঁর ব্যাটিংয়ে একটা স্বাভাবিক সৌন্দর্য ছিল। অনেক সময় মনে হতো, বলটাকে তিনি আঘাত করছেন না—বলটা যেন তাঁর ব্যাটে এসে নিজেই সীমারেখা খুঁজে নিচ্ছে। এ কারণেই আশরাফুলের ব্যাটিংয়ের কিছু ইনিংস আজও হাইলাইটসের চেয়েও বেশি কিছু।
সেগুলো বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্মৃতি।

আইপিএলে শচীনের সঙ্গে?
আরেকটি প্রতীকী মুহূর্তও ভুলে যাওয়ার নয়। আশরাফুল আইপিএলে ডাক পেয়েছিলেন।
মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে শচীন টেন্ডুলকারের সঙ্গে একই ড্রেসিংরুমে ছিলেন, একই দলের অংশ ছিলেন।
একজন বাংলাদেশের কিশোর, যার ক্রিকেট-স্বপ্নের অন্যতম নায়ক ছিলেন শচীন, একসময় সেই শচীনের সঙ্গে একই দলের জার্সি পরছেন। বাংলাদেশের ক্রিকেট তখনও বিশ্ব ক্রিকেটের মূল স্রোতে নিজের জায়গা খুঁজছে। আশরাফুল ছিলেন সেই যাত্রার অন্যতম মুখ।
কিন্তু তারপর অন্ধকার অধ্যায়
এখানে এসে আশরাফুলকে নিয়ে সবচেয়ে কঠিন সত্যটাও বলতে হবে।
২০১৩ সালে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে দুর্নীতির ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যে আসে। তিনি ভুল স্বীকার করে ক্ষমাও চান। পরে আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী বিধির আওতায় নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েন। তাঁর ক্যারিয়ারের এই অধ্যায় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম বেদনাদায়ক ঘটনা।
এই দাগ মুছে ফেলার চেষ্টা করার দরকার নেই। একজন খেলোয়াড়ের মহত্ত্ব মানে তাঁর ভুল অস্বীকার করা নয়। বরং একজন মানুষকে তাঁর সাফল্য এবং ব্যর্থতা—দুই দিক মিলিয়েই বিচার করতে হয়। আশরাফুল ভুল করেছেন। বড় ভুল করেছেন। সেই ভুলের শাস্তিও পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর ভুল তাঁর ব্যাটিং প্রতিভাকে মুছে দেয় না।
যেমন তাঁর ব্যাটিং প্রতিভা তাঁর ভুলকে মুছে দিতে পারে না। দুটো সত্য একই সঙ্গে সত্য হতে পারে।
কোচ আশরাফুল সফল হবেন কি?
সম্ভবত একজন কোচ হিসেবে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিজের ক্রিকেটীয় অভিজ্ঞতাকে কাঠামোবদ্ধ কোচিং জ্ঞানে রূপান্তর করা।
কারণ খেলোয়াড় হিসেবে কোনো শট খেলা আর একজন তরুণ ব্যাটারকে সেই শট শেখানো এক বিষয় নয়।
একজন ভালো কোচকে জানতে হয়—
কখন আক্রমণ করতে হবে,
কখন থামতে হবে,
কীভাবে একজন ব্যাটারের মানসিকতা বুঝতে হবে,
কীভাবে টেকনিকের ত্রুটি শনাক্ত করতে হবে,
কীভাবে একজন খেলোয়াড়ের স্বাভাবিক প্রতিভাকে নষ্ট না করে তাকে আরও কার্যকর করা যায়।
আশরাফুলের নিজের ক্যারিয়ার এই জায়গায় তাঁকে একটি অমূল্য শিক্ষা দিতে পারে।
তিনি জানেন প্রতিভা কী।
তিনি জানেন আত্মবিশ্বাস কী।
তিনি জানেন ভুল শটের মূল্য কী।
তিনি জানেন একটি ম্যাচ একাই ঘুরিয়ে দেওয়ার অনুভূতি কী।
এবং সবচেয়ে বড় কথা—
তিনি জানেন অসাধারণ প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও ধারাবাহিক হতে না পারার যন্ত্রণা কী। একজন তরুণ ব্যাটারকে এই অভিজ্ঞতা থেকে শেখাতে পারলে সেটিই হতে পারে তাঁর কোচিং ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শক্তি।
এগুলো বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অংশ। আর একটা প্রজন্মের কাছে এগুলো শুধু পরিসংখ্যানও নয়। এগুলো ছিল আশা।
‘আশার ফুল’
আজকের প্রজন্ম হয়তো আশরাফুলকে তাঁর ক্যারিয়ার গড় দিয়ে বিচার করবে।
তারা হয়তো বলবে—কেন আরও বেশি রান করলেন না?
কেন আরও বেশি সেঞ্চুরি হলো না?
কেন এত দ্রুত আউট হতেন?
কেন নিজের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করতে পারলেন না?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে হয়তো তারা বুঝবে, আশরাফুলের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিই ছিল তাঁর প্রতিভা।
তিনি যতটা ভালো হতে পারতেন, শেষ পর্যন্ত ততটা হতে পারেননি।
কিন্তু তিনি যে ভালো ছিলেন না এটা বলা, ইতিহাসের সঙ্গে অন্যায়।
তিনি ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম বড় ‘ইভেন্ট’।
তিনি ছিলেন সেই সময়ের ক্রিকেটার, যার ব্যাটিং দেখতে মানুষ কাজ ফেলে টেলিভিশনের সামনে বসত।
তিনি ছিলেন সেই ব্যাটার, যিনি ক্রিজে নামলে বাংলাদেশের মানুষ মনে মনে বলত—
‘আজকে কিছু একটা হবে।’
সব দিন হতো না। অনেক দিনই হতো না। কিন্তু যেদিন হতো, পুরো বাংলাদেশ মনে রাখত। এই কারণেই আশরাফুল শুধু একজন সাবেক ক্রিকেটার নন। তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটের একটি যুগের নাম। তাঁর ক্যারিয়ারে হতাশা আছে, অপরাধ আছে, পতন আছে।
কিন্তু তার পাশাপাশি আছে এমন কিছু মুহূর্ত, যেগুলো বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আত্মবিশ্বাসী হতে শিখিয়েছে। তাই নতুন অধ্যায়ে শুভকামনা, মোহাম্মদ আশরাফুল।
কোচ হিসেবে আপনি কতটা সফল হবেন, সেটা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু ক্রিকেটার আশরাফুলকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার ক্ষমতা কারও নেই। কারণ সাকিব আসার আগে, তামিম আসার আগে, মুশফিক-লিটনদের আগেও, একজন ছেলেকে আমরা ব্যাট হাতে দেখে বিশ্বাস করতে শিখেছিলাম যে বাংলাদেশও পারে।
সেই ছেলেটির নাম ছিল মোহাম্মদ আশরাফুল।
আর আমাদের প্রজন্ম তাঁকে যে নামে ডাকত— আশার ফুল।
