চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

বালিয়াড়ি কেটে বা বদলে উন্নয়ন নয়, প্রকল্পের নকশা ও পরিবেশগত প্রভাব পুনর্মূল্যায়নের দাবি আন্দোলনকারীদের

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার শুধু বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রও। সমুদ্র, বালিয়াড়ি, জোয়ার-ভাটা, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন-জীবিকার মধ্যে গড়ে ওঠা এই ভূপ্রকৃতি সামান্য পরিবর্তনেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।

এই বাস্তবতায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন এলাকায় চলমান সড়ক নির্মাণকাজ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পরিবেশবাদী সংগঠন ইকো-ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট বাংলাদেশ। সংগঠনটি অবিলম্বে চলমান নির্মাণকাজ স্থগিত করে প্রকল্পের নকশা, সড়কের বর্তমান এলাইনমেন্ট এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব স্বাধীনভাবে পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবার কক্সবাজারে আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে সংগঠনটির নেতারা বলেন, উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁদের আপত্তি নেই। তবে এমন কোনো উন্নয়ন যেন না হয়, যার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দিতে হয় সৈকত, পরিবেশ, স্থানীয় অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।

৯ মিটার থেকে ২৮ মিটার করিডর: প্রশ্ন উঠছে প্রকল্পের পরিধি নিয়ে

আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯ মিটার প্রস্থের বিদ্যমান সড়ককে সৈকত-সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ২৮ মিটার প্রশস্ত করিডরে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে উঁচু বাঁধ বা ডাইক এবং সেতু কিংবা ভায়াডাক্ট ধরনের কাঠামো নির্মাণের বিষয়ও রয়েছে।

তাঁদের আশঙ্কা, এমন বড় আকারের অবকাঠামো নির্মাণের ফলে কক্সবাজারের বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় প্রাকৃতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে।

প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য, বালিয়াড়ি কেবল সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যের অংশ নয়। উপকূলীয় ভূপ্রকৃতিতে এর রয়েছে প্রাকৃতিক ভূমিকা। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বাতাস ও বালুর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহের সঙ্গে বালিয়াড়ির সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সৈকতসংলগ্ন কোনো বড় অবকাঠামো নির্মাণের আগে এর সম্ভাব্য প্রভাব যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

তাঁদের মতে, বিষয়টি শুধু একটি সড়ক নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রশ্ন হচ্ছে—এই উন্নয়ন প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক চরিত্রকে কতটা বদলে দিতে পারে।

পূর্ববর্তী নকশা ও বর্তমান কাজের মধ্যে পার্থক্যের অভিযোগ

প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি উঠে এসেছে, তা হলো প্রকল্পের সড়ক এলাইনমেন্ট নিয়ে।

ইকো-ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট বাংলাদেশের দাবি, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আরবান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিটি গভর্ন্যান্স প্রজেক্টের (ইউডিসিজিপি) অধীনে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে মেরিন ড্রাইভ পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের পূর্ববর্তী পরিকল্পনায় যে এলাইনমেন্ট দেখানো হয়েছিল এবং বর্তমানে যে এলাকায় নির্মাণকাজ চলছে—দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

সংগঠনটির দাবি, পূর্ববর্তী পরিকল্পনায় সড়কটি বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে নেওয়ার কথা ছিল না।

এখন প্রশ্ন উঠছে, প্রকল্পের নকশা বা এলাইনমেন্টে যদি পরিবর্তন হয়ে থাকে, তাহলে সেই পরিবর্তনের পেছনে কী ধরনের কারিগরি মূল্যায়ন করা হয়েছে? পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন হয়েছে কি না? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন কীভাবে নেওয়া হয়েছে?

আন্দোলনকারীরা এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।

তবে অভিযোগের বিপরীতে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পে নকশা পরিবর্তনের পেছনে কারিগরি, নিরাপত্তাজনিত কিংবা বাস্তবভিত্তিক কারণ থাকতে পারে। সেই কারণগুলো স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হলে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্ন ও সন্দেহ অনেকটাই দূর হতে পারে।

উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত মূল্যায়ন কেন গুরুত্বপূর্ণ

কক্সবাজারে পর্যটন ও নগর উন্নয়নের চাপ গত কয়েক দশকে দ্রুত বেড়েছে। নতুন হোটেল, আবাসন, সড়ক, পর্যটন অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কারণে শহর ও সৈকত এলাকার ওপর চাপও বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের একটি বড় উদ্বেগ হলো—উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আলাদা আলাদাভাবে গ্রহণ করা হলেও তাদের সম্মিলিত প্রভাব কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

একটি সড়ক প্রকল্প হয়তো স্বতন্ত্রভাবে ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু একই এলাকায় যদি একের পর এক সড়ক, হোটেল, বাঁধ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো তৈরি হয়, তাহলে সামগ্রিক পরিবেশগত প্রভাব অনেক বড় হয়ে উঠতে পারে।

তাই আন্দোলনকারীদের দাবি, শুধু প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন নয়, কক্সবাজারের পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ধারণক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

পর্যটনের জন্য সড়ক, নাকি সড়কের জন্য পর্যটন?

কক্সবাজারের অর্থনীতির বড় একটি অংশ পর্যটনকে ঘিরে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহন এবং বিভিন্ন সেবাখাতের সঙ্গে সৈকতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

তাই উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও আধুনিক অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যে পর্যটনকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন, সেই উন্নয়ন যদি পর্যটনের প্রধান আকর্ষণকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর ফল কী হবে?

সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, উন্মুক্ততা এবং মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার কক্সবাজারের অন্যতম শক্তি। অতিরিক্ত কংক্রিট কাঠামো বা অপরিকল্পিত উন্নয়ন যদি সেই অভিজ্ঞতাকে বদলে দেয়, তাহলে এর প্রভাব পর্যটন শিল্পেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্দোলনকারীরা।

জননিরাপত্তা ও প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন

প্রতিবাদকারীরা শুধু পরিবেশ নয়, জননিরাপত্তা এবং মানুষের সৈকতে প্রবেশাধিকারের বিষয়টিও সামনে এনেছেন।

সৈকত-সংলগ্ন এলাকায় বড় সড়ক, উঁচু বাঁধ বা ভায়াডাক্ট ধরনের অবকাঠামো নির্মিত হলে পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের চলাচলে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে—তা আগে থেকেই বিবেচনা করা দরকার বলে তাঁরা মনে করেন।

বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতি, জলোচ্ছ্বাস বা দুর্যোগের সময় এসব অবকাঠামো মানুষের নিরাপত্তায় কী ভূমিকা রাখবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

অবকাঠামো প্রকল্পের সাফল্য কেবল নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। একটি প্রকল্প কতটা নিরাপদ, ব্যবহারবান্ধব, পরিবেশসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই—সফলতার প্রকৃত মাপকাঠি হওয়া উচিত সেটিই।

চারটি মূল দাবি

ইকো-ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট বাংলাদেশ প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে চারটি প্রধান দাবি তুলে ধরেছে।

প্রথমত, চলমান CPB-RB2 ও CPB-RB4 অংশের নির্মাণকাজ জরুরি ভিত্তিতে স্থগিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বর্তমান সড়ক এলাইনমেন্ট অনুমোদিত নকশা ও পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে।

তৃতীয়ত, পরিকল্পনা বা এলাইনমেন্টে কোনো পরিবর্তন হয়ে থাকলে তার পেছনের কারিগরি ভিত্তি, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং অনুমোদনের তথ্য প্রকাশ করতে হবে।

চতুর্থত, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গ্রহণযোগ্য পেশাদার প্রতিষ্ঠান, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় অংশীজন ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে প্রকল্পটির পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।

প্রতিবাদ মানেই উন্নয়নবিরোধিতা নয়

বাংলাদেশে পরিবেশ নিয়ে কথা বললেই অনেক সময় উন্নয়ন বনাম পরিবেশ—এমন একটি দ্বন্দ্ব তৈরি করা হয়।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, টেকসই উন্নয়ন এই দুইয়ের কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার নাম নয়। প্রকৃত উন্নয়ন হলো এমন পরিকল্পনা, যেখানে মানুষের প্রয়োজন মেটানো হবে, আবার প্রকৃতির ধারণক্ষমতাও রক্ষা করা হবে।

ইকো-ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট বাংলাদেশের বক্তব্যও সেদিকেই ইঙ্গিত করে।

সংগঠনটি বলছে, তারা উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয়। বরং এমন উন্নয়ন চায়, যা পরিবেশ, জনস্বার্থ, স্থানীয় অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই অবস্থানকে কেবল একটি প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব কমে যাবে। বরং এটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।

যাঁরা বক্তব্য দিয়েছেন

প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন ভয়েস অব কক্সবাজার ভলান্টিয়ারের সভাপতি মো. কামরুল হাসান, CEHRDF-এর যুগ্ম-প্রধান লিডার আব্দুল মান্নান রানা, YASID-এর প্রতিষ্ঠাতা কাইসার হামিদ, ইউথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের জলবায়ু কর্মী জিমরান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কক্সবাজার জেলার সাবেক আহ্বায়ক এস এস সাগর, ইউথ পিস অ্যাম্বাসেডর (ওয়াইপিজি) সদর উপজেলা কক্সবাজারের সমন্বয়কারী আরিয়ান খান ফারাবী এবং ইকো-ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট কক্সবাজারের মুখপাত্র মো. জাবেদ নূর শান্ত।

এখন প্রয়োজন স্বচ্ছ উত্তর

কক্সবাজারের মতো সংবেদনশীল উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। বরং প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া থাকা জরুরি।

প্রকল্পটি যদি পরিবেশগতভাবে নিরাপদ এবং কারিগরিভাবে যথাযথ হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত তার বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি ভিত্তি জনসমক্ষে তুলে ধরা। আর যদি নকশা পরিবর্তনের ফলে নতুন কোনো পরিবেশগত বা সামাজিক ঝুঁকি তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে তা পুনর্বিবেচনা করাও দায়িত্বশীল উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার অংশ।

কারণ কক্সবাজারের ভবিষ্যৎ শুধু একটি সড়ক প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এটি বাংলাদেশের পর্যটনের ভবিষ্যৎ, উপকূলীয় পরিবেশের ভবিষ্যৎ এবং এমন একটি শহরের ভবিষ্যৎ, যেখানে উন্নয়ন ও প্রকৃতিকে একসঙ্গে টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে।

সমুদ্রের ঢেউ প্রতিদিন বালিয়াড়ির ওপর নতুন রেখা আঁকে। মানুষও উন্নয়নের নামে সেই ভূদৃশ্যে নতুন রেখা টানে। প্রশ্ন হলো—সেই রেখা কি প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের, নাকি এমন এক পরিবর্তনের, যার মূল্য একদিন কক্সবাজারকেই দিতে হবে?

উন্নয়ন থেমে থাকা কোনো সমাধান নয়। কিন্তু উন্নয়নের আগে থেমে প্রশ্ন করা—সেটিও হয়তো একটি দায়িত্বশীল সমাজের লক্ষণ।

ছবিঃ Eco-Democratic Movement Bangladesh