চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
দ্রুত নগরায়ণ, আবাসন খাতের সম্প্রসারণ এবং একের পর এক অবকাঠামো প্রকল্পে বদলে যাচ্ছে চট্টগ্রামের নগরচিত্র। কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়ছে অপরিকল্পিত নির্মাণ, পরিবেশগত চাপ, জলাবদ্ধতা, পাহাড় ও খাল দখল এবং বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগও। এমন বাস্তবতায় শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়, বরং কেমন শহর গড়ে উঠছে এবং সেই শহর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কতটা টেকসই হবে? এই প্রশ্নকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে ‘চট্টগ্রাম বিল্ড এক্সপো ২০২৬’।
বন্দরনগরীতে প্রথমবারের মতো আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়েছে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) নগরীর পাঁচতারকা হোটেল র্যাডিসন ব্লু Radisson Blu তে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন এর উদ্বোধন করেন।
ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (আইএবি), চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের উদ্যোগে আয়োজিত এ এক্সপো চলবে ২২ আগস্ট পর্যন্ত। দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত এই আয়োজনে ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে।

শুধু প্রদর্শনী নয়, নগর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নও
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে শুধু পরিকল্পনা প্রণয়ন করলেই হবে না; পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তার বক্তব্যের মধ্যেই উঠে আসে চট্টগ্রামের নগর উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা, একটি শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব কোনো একটি সংস্থা, পেশাজীবী বা প্রতিষ্ঠানের একার নয়।
স্থপতি, প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ, আবাসন উদ্যোক্তা, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা এবং সাধারণ নাগরিক, সবার সিদ্ধান্ত ও ভূমিকার সম্মিলনেই তৈরি হয় একটি শহরের ভবিষ্যৎ।
বেলায়েত হোসেন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব নির্মাণপদ্ধতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তিনি অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
চট্টগ্রামের মতো একটি দ্রুত সম্প্রসারণশীল নগরের জন্য এই বার্তাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে উন্নয়নের প্রশ্নটি কেবল কতগুলো নতুন ভবন বা ফ্লাইওভার নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাহাড়, নদী, খাল, উপকূল এবং ঘনবসতিপূর্ণ নগরজীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান জরুরি।

নির্মাণ খাতের সঙ্গে প্রযুক্তি ও ভাবনার সংযোগ
চট্টগ্রাম বিল্ড এক্সপোতে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী, প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করছে। পাশাপাশি রয়েছে ব্র্যান্ড অ্যাকটিভেশন, ব্যবসায়িক যোগাযোগ, নেটওয়ার্কিং এবং খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে সেমিনার ও আলোচনা।
আয়োজকদের মতে, এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো স্থাপত্য, নির্মাণ, রিয়েল এস্টেট ও অবকাঠামো খাতের সাম্প্রতিক উদ্ভাবন, সম্ভাবনা এবং প্রযুক্তি এক জায়গায় তুলে ধরা।
এক্সপোর আহ্বায়ক স্থপতি মো. মিজানুর রহমান বলেন, পেশাজীবী, উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি কার্যকর ক্ষেত্র তৈরি করাই এই আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন এক্সপোর উপদেষ্টা স্থপতি মেহেদী ইফতেখার, সদস্য স্থপতি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী, ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ড. মাসুদ উর রশীদ এবং চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট খাতের বিভিন্ন প্রতিনিধি।

উন্নয়ন মানেই কি শুধু নতুন নির্মাণ?
চট্টগ্রামে নতুন আবাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে, নগর সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং মানুষের আবাসনের চাহিদাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
তবে নগর বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্ন এখানেও প্রাসঙ্গিক- উন্নয়ন যদি পরিবেশ, জননিরাপত্তা ও বাসযোগ্যতাকে পেছনে ফেলে এগোয়, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই?
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস, খাল ও জলাধার সংকট কিংবা অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণের মতো সমস্যাগুলো দেখিয়ে দেয়, নগর উন্নয়নে পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের মধ্যে এখনো বড় ফাঁক রয়েছে।
এ কারণেই ‘বিল্ড এক্সপো’র মতো আয়োজনের প্রকৃত গুরুত্ব কেবল নতুন পণ্য বা প্রযুক্তি প্রদর্শনে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এখান থেকে যদি পরিবেশবান্ধব নির্মাণ, নিরাপদ স্থাপত্য, জ্বালানি সাশ্রয়, দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো এবং মানুষের জন্য বাসযোগ্য নগর গঠনের বাস্তব আলোচনা তৈরি হয়, তাহলে এই উদ্যোগের প্রভাব প্রদর্শনীর তিন দিনের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ব্যবসার পাশাপাশি দরকার জনস্বার্থের ভাবনা
নির্মাণ ও রিয়েল এস্টেট খাত স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় ব্যবসায়িক ক্ষেত্র। নতুন প্রযুক্তি, উন্নত নির্মাণসামগ্রী এবং আধুনিক নকশা এই খাতকে এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন থাকে—এই প্রযুক্তি কতটা সাশ্রয়ী, কতটা পরিবেশবান্ধব এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে কতটা?
টেকসই নগর উন্নয়নের আলোচনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন সেখানে শুধু বহুতল ভবন বা আধুনিক স্থাপত্য নয়, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের আবাসন, উন্মুক্ত স্থান, পথচারীর নিরাপত্তা, শিশু ও প্রবীণবান্ধব নগরব্যবস্থা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও সমান গুরুত্ব পাবে।
চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনায় এ বিষয়গুলো উপেক্ষিত হলে উন্নয়নের দৃশ্যমান অবকাঠামো বাড়লেও নাগরিক জীবনের স্বস্তি বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
একটি প্রদর্শনী, নাকি পরিবর্তনের সূচনা?
চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো এমন আয়োজন স্থাপত্য ও নির্মাণ খাতের পেশাজীবীদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। একই ছাদের নিচে প্রযুক্তি, ব্যবসা, পেশাদার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বিনিময় নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।
তবে আয়োজনের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে আলোচনাগুলো প্রদর্শনীর মঞ্চ থেকে বাস্তব নগর পরিকল্পনা ও নির্মাণনীতিতে কতটা প্রতিফলিত হয় তার ওপর।
চট্টগ্রাম এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন শহরটির উন্নয়ন থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু উন্নয়নের গতি যত বাড়বে, পরিকল্পনা ও জবাবদিহির প্রয়োজনও তত বাড়বে।
চট্টগ্রাম বিল্ড এক্সপো ২০২৬ সেই প্রয়োজনীয় আলোচনার একটি সূচনা হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, এই আলোচনা কি শুধু নির্মাণ খাতের ব্যবসায়িক সম্ভাবনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এখান থেকে সত্যিই এমন একটি চট্টগ্রাম গড়ার চিন্তা তৈরি হবে, যেখানে উন্নয়ন, পরিবেশ এবং মানুষের জীবন- তিনটিই সমান গুরুত্ব পাবে?
তিন দিনব্যাপী ‘চট্টগ্রাম বিল্ড এক্সপো ২০২৬’ চলবে ২২ আগস্ট পর্যন্ত এবং প্রদর্শনীটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
