পিএসজির সামনে বার্সেলোনা ও ম্যানচেস্টার সিটি, রিয়াল মাদ্রিদের প্রতিপক্ষ ইন্টার ও আর্সেনাল—চ্যাম্পিয়নস লিগের নতুন লিগ পর্বের ড্র যেন প্রথম দিন থেকেই ইউরোপীয় ফুটবলের মহারণের ঘোষণা দিয়ে দিল।
ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর চ্যাম্পিয়নস লিগে এখন আর অপেক্ষা করতে হয় শেষ ষোলো কিংবা কোয়ার্টার ফাইনালের জন্য। নতুন লিগ-পর্বের কাঠামো এমনভাবে সাজানো যে, মৌসুমের শুরু থেকেই বড় দলগুলোর সামনে বড় পরীক্ষা।
৩৬ দলের এই লিগ পর্বের ড্র শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় আলোচনায় উঠে এসেছে কয়েকটি ম্যাচ—চ্যাম্পিয়ন পিএসজির বিপক্ষে বার্সেলোনা ও ম্যানচেস্টার সিটি, রিয়ালের সামনে ইন্টার মিলান ও আর্সেনাল, আর আর্সেনালের প্রতিপক্ষ হিসেবে বায়ার্ন মিউনিখ। নামগুলোই বলে দিচ্ছে, এবার ইউরোপের সেরা হওয়ার পথ মোটেও মসৃণ নয়।
নতুন ফরম্যাট, কিন্তু পুরোনো উত্তেজনা আরও আগে
চ্যাম্পিয়নস লিগের নতুন কাঠামো নিয়ে শুরুতে অনেক প্রশ্ন ছিল। কেউ বলেছিলেন, বেশি ম্যাচ মানে খেলোয়াড়দের ওপর বাড়তি চাপ। কেউ আবার মনে করেছিলেন, নতুন পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
কিন্তু ড্রয়ের ফল অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—বড় ম্যাচের জন্য এবার আর নকআউট পর্ব পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না।
প্রতিটি দল আটটি ম্যাচ খেলবে। চারটি ভিন্ন পট থেকে দুটি করে প্রতিপক্ষ পাবে তারা। ফলে কোনো দলের সামনে শুধু অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পয়েন্ট সংগ্রহের সুযোগ নেই। একই সঙ্গে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করার পরীক্ষাও দিতে হবে।
লিগ পর্ব শেষে শীর্ষ আট দল সরাসরি শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেবে। নবম থেকে ২৪তম স্থানে থাকা দলগুলোকে খেলতে হবে নকআউট প্লে-অফ। অর্থাৎ শুধু টিকে থাকাই যথেষ্ট নয়, যতটা সম্ভব ওপরের দিকে থেকে শেষ করাও এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই কাঠামোতে একটি ম্যাচের গুরুত্বও বেড়ে গেছে। একটি অপ্রত্যাশিত হার কোনো বড় দলকে সরাসরি শেষ ষোলো থেকে প্লে-অফের অতিরিক্ত চাপে ঠেলে দিতে পারে।






পিএসজির সামনে দুই মহাশক্তি
টানা দুইবারের চ্যাম্পিয়ন পিএসজির ড্র নিঃসন্দেহে সবচেয়ে আলোচিত। লিগ পর্বেই তাদের খেলতে হবে বার্সেলোনা ও ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে।
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর সাধারণত একটি দলের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে—তারা কি সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে?
পিএসজির ক্ষেত্রে সেই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইউরোপের শীর্ষে ওঠা এক বিষয়, কিন্তু সেই জায়গা ধরে রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ।
বার্সেলোনার বিপক্ষে ম্যাচ হবে আক্রমণাত্মক ফুটবল ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের লড়াই। অন্যদিকে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে ম্যাচ পিএসজির জন্য হবে আধুনিক ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি।
তবে এখানেই পিএসজির জন্য সুযোগও আছে। মৌসুমের শুরুতেই বড় দলের বিপক্ষে ভালো ফল করতে পারলে আত্মবিশ্বাস কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। আবার ব্যর্থ হলে চাপও বাড়বে দ্রুত।
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর প্রতিটি ম্যাচে পিএসজিকে এবার প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হিসেবে মাঠে নামতে হবে—এটাই হয়তো শিরোপা ধরে রাখার সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা।
রিয়ালের সামনে ইন্টার ও আর্সেনাল: অভিজ্ঞতা বনাম নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষা
চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে রিয়াল মাদ্রিদের মতো আর কোনো ক্লাব এতটা স্বাভাবিকভাবে এই প্রতিযোগিতার সঙ্গে মিশে যেতে পারেনি। ১৫ বারের চ্যাম্পিয়ন দলটির জন্য ইউরোপীয় রাত মানেই আলাদা এক পরিচিত পরিবেশ।
তবে ইতিহাস কোনো ম্যাচ জেতায় না—এ কথাও রিয়াল ভালো করেই জানে।
লিগ পর্বে ইন্টার মিলান ও আর্সেনালের মুখোমুখি হওয়া তাই রিয়ালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ইন্টার ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞ ও কৌশলগতভাবে পরিণত দল। অন্যদিকে আর্সেনাল এখন আর শুধু প্রতিভাবান একটি তরুণ দল নয়; তারা ইউরোপের বড় মঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার পথে এগিয়ে চলেছে।
আর্সেনালের জন্য রিয়ালের বিপক্ষে ম্যাচটি হতে পারে নিজেদের মানসিক শক্তি যাচাইয়ের সুযোগ।
বড় দলের বিপক্ষে ভালো ফুটবল খেলা এক জিনিস, আর ম্যাচের চাপ সামলে ফল বের করে আনা আরেক জিনিস। চ্যাম্পিয়নস লিগে শেষ পর্যন্ত এই দ্বিতীয় দক্ষতাটিই সবচেয়ে বেশি মূল্যবান।

আর্সেনালের জন্য বায়ার্নও বড় পরীক্ষা
আর্সেনাল শুধু রিয়াল নয়, বায়ার্ন মিউনিখের মতো প্রতিপক্ষও পেয়েছে। ফলে তাদের লিগ পর্বের সূচি যে সহজ নয়, সেটি বলাই যায়।
গত কয়েক মৌসুমে আর্সেনাল ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার জন্য শুধু ধারাবাহিকতা নয়, প্রয়োজন বড় ম্যাচে বিশেষ কিছু করার ক্ষমতা।
বায়ার্নের বিপক্ষে ম্যাচ তাই আর্সেনালের জন্য শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই হবে না। এটি হবে নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ।
প্রশ্ন হলো, আর্সেনাল কি এবার সত্যিই ইউরোপের শিরোপার জন্য প্রস্তুত, নাকি তারা এখনো সেই চূড়ান্ত অভিজ্ঞতার অপেক্ষায়?
নতুন লিগ পর্বে ছোট দলের জন্যও সুযোগ
নতুন ফরম্যাটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শুধু ইউরোপের প্রতিষ্ঠিত জায়ান্টরাই নয়, প্রথমবারের মতো অংশ নেওয়া বা অপেক্ষাকৃত ছোট ক্লাবগুলোর সামনেও নিজেদের পরিচয় তৈরি করার সুযোগ থাকছে।
৩৬ দলের এই প্রতিযোগিতায় প্রত্যেক ম্যাচের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। ফলে একটি ছোট দলও কয়েকটি অপ্রত্যাশিত ফলের মাধ্যমে পুরো পয়েন্ট টেবিলের হিসাব বদলে দিতে পারে।
তবে এখানেই বাস্তবতার আরেকটি দিক রয়েছে।
বড় ক্লাবগুলোর স্কোয়াডের গভীরতা, আর্থিক সক্ষমতা ও বেঞ্চ শক্তি দীর্ঘ মৌসুমে তাদের বাড়তি সুবিধা দেয়। নতুন ফরম্যাটে ম্যাচের সংখ্যা বাড়ায় এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও আছে।
ছোট দলগুলোর জন্য তাই প্রতিটি ম্যাচই হবে প্রায় ফাইনালের মতো।
খেলোয়াড়দের ক্লান্তি: নতুন ফরম্যাটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
চ্যাম্পিয়নস লিগের নতুন কাঠামো দর্শকদের জন্য যতটা আকর্ষণীয়, খেলোয়াড়দের জন্য ততটাই কঠিন হতে পারে।
ইতোমধ্যে ক্লাব ফুটবলের ক্যালেন্ডার অত্যন্ত ব্যস্ত। ঘরোয়া লিগ, কাপ, ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক ম্যাচ—সব মিলিয়ে শীর্ষ পর্যায়ের খেলোয়াড়দের বিশ্রামের সময় দিন দিন কমছে।
বেশি ম্যাচ মানে বেশি উত্তেজনা, কিন্তু বেশি ম্যাচ মানে চোটের ঝুঁকিও বেশি।
এখানে ক্লাবগুলোর কোচদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। শুধু সেরা একাদশ থাকলেই হবে না; পুরো স্কোয়াডকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে।
চ্যাম্পিয়নস লিগের নতুন বাস্তবতায় হয়তো সবচেয়ে শক্তিশালী দল সেই নয়, যার প্রথম একাদশ সবচেয়ে ভালো; বরং সেই দল, যার ২২-২৩ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে মানের ব্যবধান সবচেয়ে কম।
বড় নামের বাইরে আসল লড়াই পয়েন্টের
ড্রয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই দর্শকদের নজর থাকবে পিএসজি-বার্সেলোনা, পিএসজি-সিটি, রিয়াল-ইন্টার কিংবা রিয়াল-আর্সেনালের মতো ম্যাচে।
কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগের নতুন ফরম্যাটে শুধু বড় ম্যাচ জিতলেই সাফল্য নিশ্চিত নয়।
একটি দল হয়তো বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দুর্দান্ত জয় পাবে, কিন্তু তুলনামূলক দুর্বল দলের কাছে পয়েন্ট হারাবে। শেষ পর্যন্ত সেই একটি ভুলই তাদের সরাসরি শেষ ষোলো থেকে প্লে-অফে নামিয়ে দিতে পারে।
তাই এবার চ্যাম্পিয়নস লিগে ধারাবাহিকতা হয়তো নাটকীয়তার চেয়েও বেশি মূল্যবান হয়ে উঠবে।
ড্রয়ের অনুষ্ঠানে অঁরি ও মারকিনিওস
ড্র অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন থিয়েরি অঁরি। সাবেক আর্সেনাল ও বার্সেলোনা তারকার হাতে তুলে দেওয়া হয় উয়েফা প্রেসিডেন্টস অ্যাওয়ার্ড।
ফুটবল ক্যারিয়ারের বাইরে মানবিক ও সামাজিক কাজের স্বীকৃতিও এই পুরস্কারের অন্যতম তাৎপর্য। অঁরির মতো একজন ফুটবলারের উপস্থিতি তাই অনুষ্ঠানে শুধু নস্টালজিয়া তৈরি করেনি, ফুটবলের মাঠের বাইরের প্রভাবের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের ‘উয়েফা রেসপেক্ট: বিয়ন্ড দ্য গেম’ পুরস্কার পেয়েছেন পিএসজির অধিনায়ক মারকিনিওস। প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে খেলাধুলার মানবিকতা যে এখনো ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এই স্বীকৃতি তারই প্রতীক।

শেষ কথা: এবার শুরু থেকেই ভুলের সুযোগ কম
চ্যাম্পিয়নস লিগের নতুন মৌসুমের ড্র একটাই বার্তা দিয়েছে—এবার অপেক্ষা নয়, শুরু থেকেই যুদ্ধ।
পিএসজি শিরোপা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে নামবে। রিয়াল মাদ্রিদ তাদের ইউরোপীয় আধিপত্য আরও দীর্ঘ করতে চাইবে। বার্সেলোনা হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে চাইবে। ম্যানচেস্টার সিটি আবারও ইউরোপের সেরার মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করতে নামবে। আর আর্সেনাল, ইন্টার, বায়ার্নসহ অন্য দলগুলো অপেক্ষা করবে সুযোগের।
তবে কাগজে-কলমে শক্তিশালী হওয়া আর মাঠে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ওঠার মধ্যে ব্যবধান অনেক।
চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—একটি মুহূর্ত, একটি ভুল, একটি গোল কিংবা একজন খেলোয়াড়ের অসাধারণ নৈপুণ্য পুরো মৌসুমের গল্প বদলে দিতে পারে।
এবারের ড্র সেই সম্ভাবনাকে আরও আগেভাগেই সামনে এনে দিয়েছে।
শুরুতেই বড় ম্যাচ, শুরুতেই বড় পরীক্ষা। আর ইউরোপের মুকুটের পথে এবার হয়তো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—শুধু সেরা হওয়া নয়, দীর্ঘ মৌসুমজুড়ে সেরা থাকা।
