কলাম

জ্বালানি নিয়ে বুলি না, নীতি চাই: তরুণদের সামনে এখন রাষ্ট্র গড়ার পরীক্ষা

নাহিদ ইসলাম ঠিকই বলেছেন: “যদি বিএনপি সরকার জনগণকে গ্যাস-বিদ্যুৎ দিতে না পারে, তাহলে ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখা উচিত নয়। গ্যাসের দাম বাড়লে সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।”

কথাটা রাজনৈতিক ভাবে আকর্ষণীয়। কিন্তু সমস্যা হলো, সরকার গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে, তারপরও সরকারের পতন হয় নাই। অতএব শুধু দাম বাড়লেই সরকার পড়ে যায়—রাজনীতি এত সরল নয়। আসল প্রশ্ন অন্য জায়গায়: এনসিপি ক্ষমতায় গেলে কী করবে? গ্যাসের দাম কীভাবে কমাবে? বিদ্যুৎ সরবরাহ কীভাবে নিশ্চিত করবে? আমদানি-নির্ভরতা কমাবে কীভাবে? জ্বালানি খাতের লুটপাট ভাঙবে কোন নীতিতে? সাপ্তাহিক চিন্তার বিশেষ জ্বালানি সংখ্যায় আমরা সমস্যা চিহ্নিত করা এবং তার সমাধান নিয়ে আলোচনা করেছি। আশা করি তরুণরা গঠন,ঊলক রাজনীতি করবেন।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলার জবাব না দিয়ে শুধু বিএনপিকে কথার ঘায়ে ঘায়েল করা রাজনীতি নয়। এটা নির্বাচনী পারফরম্যান্স—ভোটারের সামনে নিজের অবস্থান চকচকে করে হাজির করার কায়দা। জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা একটি রাজনৈতিক শক্তির কাজ যদি শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে বিদ্রূপ করা, স্লোগান ছোঁড়া এবং ভোটের বাজারে জনপ্রিয় বাক্য বিক্রি করা হয়, তাহলে সেই শক্তির ঐতিহাসিক সম্ভাবনা খুব দ্রুত নিঃশেষ হবে।

বাংলাদেশ এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে জ্বালানি কোনো মন্ত্রণালয়ের আলাদা খাত নয়। জ্বালানি রাষ্ট্রের বস্তুগত ভিত্তি। জ্বালানি মানে উৎপাদন, শিল্প, কৃষি, পরিবহন, খাদ্য, নগরজীবন, সামরিক সক্ষমতা এবং শেষ বিচারে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা। যে রাষ্ট্র নিজের জ্বালানি নিশ্চিত করতে পারে না, সে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বও রক্ষা করতে পারে না।

আর এখন জ্বালানি শুধু দেশের ভেতরের বাজারের ব্যাপারও নয়। তেল, গ্যাস, কয়লা, এলএনজি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন, আঞ্চলিক গ্রিড, সমুদ্রপথ, নিষেধাজ্ঞা, ডলার-নির্ভর লেনদেন—সবই ভূরাজনীতির অংশ। কে কার কাছ থেকে জ্বালানি কিনবে, কোন মুদ্রায় কিনবে, কোন জোটের সঙ্গে থাকবে, কোন নিষেধাজ্ঞা মানবে, কোন চাপ অগ্রাহ্য করবে—এগুলো এখন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন।

এখানে পুরানা রাষ্ট্রতত্ত্ব দিয়ে আর কাজ হবে না। সংসদ, নির্বাচন, সরকার, বিরোধী দল—এই কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাজনীতি আটকে রাখলে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট বোঝা যাবে না। জনগণের রাজনীতি মানে জনগণের বাস্তব জীবন টিকিয়ে রাখার রাজনীতি। আর সেই বাস্তব জীবনের একেবারে কেন্দ্রে এখন জ্বালানি।

এনসিপিকে তাই বলতে হবে, তারা কোন জ্বালানি রাষ্ট্রনীতি চায়। শুধু বিএনপি কী ভুল করছে, সেটা বললে চলবে না। নিজেদের প্রস্তাব কোথায়?

আরেকটি বড় প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নাই। আওয়ামী আমলে বিদ্যুৎ খাতে এমন সব চুক্তি হয়েছে যেখানে বিদ্যুৎ না নিলেও নির্দিষ্ট বিধ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ধরে রাখার নামে কোম্পানিকে টাকা দিতে হয়—যাকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বলা হয়। অর্থাৎ জনগণ বিদ্যুৎ পাক বা না পাক, রাষ্ট্রকে টাকা গুনতে হয়। এই ব্যবস্থার রাজনৈতিক অর্থ পরিষ্কার: ঝুঁকি জনগণের, মুনাফা কোম্পানির।

এনসিপি কী করবে এই চুক্তিগুলো নিয়ে? পর্যালোচনা করবে? বাতিল করবে? পুনর্নির্ধারণ করবে? দায়ী আমলা, মন্ত্রী ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর জবাবদিহি করবে? নাকি “চুক্তির ধারাবাহিকতা”র নামে পুরানা লুটের ব্যবস্থাই বহাল রাখবে?

এখানেই সংসদীয় রাজনীতির আসল ফাঁদ।

যাদের টাকা দিয়ে নির্বাচন হয়, যাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে দল চলে, যাদের পুঁজি ছাড়া প্রার্থী মাঠে দাঁড়াতে পারে না—সংসদে গিয়ে সেই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই কি আইন করা যাবে? সংসদ যদি ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, আমদানিকারক, ব্যাংক-মালিক ও করপোরেট স্বার্থের প্রতিনিধিদের দখলে থাকে, তাহলে সেই সংসদ জনগণের আইনসভা নয়; সেটি মুনাফার বৈধতা দেওয়ার কারখানা হয়ে ওঠে।

তখন প্রশ্ন আর শুধু “কে সরকার গঠন করবে” থাকে না। প্রশ্ন হয়: রাষ্ট্র কার?

যদি রাষ্ট্র লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণীর সম্পদ সুরক্ষার যন্ত্র হয়ে থাকে, তাহলে শুধু সরকার বদলে জ্বালানি সংকটের সমাধান হবে না। রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাতে হবে। গণসার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে জনগণকে রাষ্ট্রের কর্তা না বানালে বিদ্যুৎ, গ্যাস, ব্যাংক, বন্দর, জমি, নদী—কোনোটার ওপরই জনগণের কার্যকর কর্তৃত্ব কায়েম হবে না।

আরও কঠিন সত্য হলো, বাংলাদেশকে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর শিল্পনীতি থেকেও বের হতে হবে। এটি কোনো ফ্যাশনের পরিবেশনীতি নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। আমদানিকৃত তেল, গ্যাস ও এলএনজির ওপর যত নির্ভরতা বাড়বে, ততই বৈদেশিক মুদ্রা, আন্তর্জাতিক বাজারদর, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও সরবরাহব্যবস্থার ধাক্কায় বাংলাদেশের অর্থনীতি কাঁপবে।

তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়া দরকার—কিন্তু স্লোগানে নয়, পরিকল্পনায়।

সৌরবিদ্যুৎ কোথায় হবে? জমি দখল না করে কীভাবে হবে? ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কত দ্রুত বাড়ানো যাবে? গ্রিড আধুনিক হবে কীভাবে? ব্যাটারি ও শক্তি সঞ্চয় প্রযুক্তি কোথা থেকে আসবে? স্থানীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলা হবে কীভাবে? বেসরকারি মুনাফার আরেকটি নতুন বাজার তৈরি হবে, নাকি জনগণের মালিকানা ও সমবায়ী ব্যবস্থার সুযোগ তৈরি হবে? কৃষিজমি, চর, উপকূল ও পাহাড়কে “সবুজ জ্বালানি”র নামে নতুন লুণ্ঠনের মাঠ বানানো হবে কি না?

এনসিপিকে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

সমস্যা হলো, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখার পরও নাহিদ ইসলামসহ তরুণ নেতৃত্ব ক্রমেই গাঠনিক রাজনীতি থেকে সরে নির্বাচনবাদী রাজনীতির দিকে ঢুকে যাচ্ছে। যেন সংসদে কিছু আসন পাওয়া, কয়েকটি ভালো বক্তৃতা দেওয়া, পুরানা দলকে আক্রমণ করা এবং টেলিভিশনে জনপ্রিয় হওয়াই রাজনীতির লক্ষ্য।

এটি আত্মঘাতী পথ।

জুলাইয়ের তারুণ্য যদি শেষ পর্যন্ত পুরানা সংসদীয় ব্যবস্থার নতুন মুখ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে গণঅভ্যুত্থান নিজের ঐতিহাসিক সম্ভাবনাই হারাবে। নতুন মুখ দিয়ে পুরানা রাষ্ট্র চালানো কোনো পরিবর্তন নয়।

সংসদীয় নাট্যাভিনয় বাংলাদেশকে বাঁচাবে না।

সামনে যে সংকট আসছে তা শুধু নির্বাচন, সরকার বা দলীয় প্রতিযোগিতার সংকট নয়। জ্বালানি, খাদ্য, ডলার, শিল্প, কর্মসংস্থান, জলবায়ু, ভূরাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় যারা শুধু নির্বাচনী বুলি বিক্রি করবে, তারা খুব দ্রুত বাস্তবতার কাছে ধরা খাবে।

তাই নাহিদ ইসলামকে প্রশ্ন করতেই হবে: বিএনপি কী পারবে না, তা আমরা শুনলাম। এনসিপি কী পারবে? কীভাবে পারবে? কোন রাষ্ট্রনীতি দিয়ে পারবে? কার স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পারবে?

জনগণকে শুধু প্রতিপক্ষবিরোধী ভাষণ উপহার দেওয়ার দরকার নাই। জনগণকে দরকার দিশা।

জুলাইয়ের তারুণ্য কি গণঅভ্যুত্থানের জ্বালানি হয়ে পুড়ে নিঃশেষ হবে, নাকি নতুন রাষ্ট্র গঠনের শক্তি হয়ে উঠবে—এখনকার আসল প্রশ্ন এটাই।

গণঅভ্যুত্থানের পর প্রধান কাজ নির্বাচন জেতা নয়। প্রধান কাজ হলো জনগণকে তার নিজের ক্ষমতা চিনতে শেখানো, সংগঠিত করা এবং সেই ক্ষমতাকে রাষ্ট্র গঠনের শক্তিতে রূপ দেওয়া।

গাঠনিক রাজনীতি ছাড়া জ্বালানি সংকটের সমাধান নাই। আর জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ছাড়া গাঠনিক রাজনীতিও সম্ভব নয়।

ফরহাদ মজহার

কবি, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক, মানবাধিকার কর্মী ও পরিবেশবাদী।