স্টাফ রিপোর্টার | সুনামগঞ্জ | ৪ আগস্ট ২০২৬
দেশের অন্যতম জনপ্রিয় জলাভূমি ও পর্যটনকেন্দ্র সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকায় হাউসবোটসহ পর্যটকবাহী সব ধরনের নৌযান চলাচলের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জলজ বাস্তুতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
তবে প্রশাসন স্পষ্ট করেছে, পুরো টাঙ্গুয়ার হাওর পর্যটকদের জন্য বন্ধ করা হয়নি। কেবলমাত্র ইসিএ হিসেবে ঘোষিত সংরক্ষিত এলাকায় পর্যটকবাহী নৌযান প্রবেশ করতে পারবে না। হাওরের অন্যান্য অনুমোদিত অংশে আগের মতোই ভ্রমণ করা যাবে, তবে নতুন নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

কেন এই নিষেধাজ্ঞা?
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে হাউসবোট ও ইঞ্জিনচালিত নৌযানের চলাচল। অতিরিক্ত শব্দদূষণ, উচ্চস্বরে গান বাজানো, অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল এবং প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য হাওরের পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণে মাছ, পরিযায়ী পাখি, জলজ উদ্ভিদ এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মতিউর রহমান খান জানান, এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য পর্যটন বন্ধ করা নয়; বরং পরিবেশবান্ধব ও নিয়ন্ত্রিত পর্যটন নিশ্চিত করা।
আগের নির্দেশনা অমান্য করায় কঠোরতা
গত বছরের জুন মাসেও টাঙ্গুয়ার হাওরে অনুরূপ নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। কিন্তু অনেক পর্যটকবাহী নৌযান সেই নির্দেশনা মানেনি। পরে সরকার ‘টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ, ২০২৫’ জারি করে সংরক্ষিত এলাকায় পরিবেশ রক্ষায় আরও কঠোর আইনি কাঠামো তৈরি করে।
সেই আইনি ভিত্তিতেই এবার জেলা প্রশাসন নতুন করে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নির্দেশনাগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে।
পর্যটকরা কোথায় যেতে পারবেন?
প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যটকরা টাঙ্গুয়ার হাওরের অনুমোদিত এলাকায় নৌভ্রমণ করতে পারবেন। তবে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকায় কোনো পর্যটকবাহী নৌযান প্রবেশ করতে পারবে না। সংরক্ষিত এই অঞ্চল মূলত পাখি, মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে।
প্রশাসন পর্যটকদের ভ্রমণের আগে নৌযান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রুট সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
নতুন নির্দেশনায় কী কী থাকছে?
জেলা প্রশাসনের জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং নৌযান পরিচালনায় একাধিক বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে হাউসবোটসহ সব পর্যটকবাহী নৌযানকে জেলা প্রশাসনের কাছে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে হবে।
- অনিবন্ধিত কোনো নৌযান টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটক পরিবহন করতে পারবে না।
- ইসিএ এলাকায় পর্যটকবাহী নৌযান প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- নৌভ্রমণের সময় উচ্চস্বরে গান বাজানো, মাইক ব্যবহার, ডিজে পার্টি বা হৈ-হুল্লোড় করা যাবে না।
- একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল-ইউজ) প্লাস্টিক বহন ও ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
- প্রতিটি নৌযানে পানি বিশুদ্ধকরণ ফিল্টার, সেপটিক ট্যাংক এবং কমপক্ষে দুটি ডাস্টবিন রাখা বাধ্যতামূলক।
- হাউসবোটের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১০০ ফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
- পর্যাপ্ত সংখ্যক লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় রিং, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র এবং গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
- ভ্রমণ শেষে কোনো ধরনের বর্জ্য হাওরে ফেলা যাবে না; নৌযানেই বর্জ্য সংরক্ষণ ও নির্ধারিত স্থানে অপসারণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

নির্দেশনা অমান্য করলে শাস্তি
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নতুন নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট নৌযান মালিক ও পরিচালকদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী জেল, জরিমানা কিংবা উভয় ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি অনিবন্ধিত নৌযানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
পরিবেশবিদদের মতে, টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি জলাভূমি, যেখানে প্রতিবছর হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি আসে এবং অসংখ্য দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল গড়ে উঠেছে। তাই হাওরের পরিবেশ রক্ষা করতে প্রশাসন, নৌযান মালিক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পর্যটকদের সম্মিলিতভাবে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
প্রশাসনের আশা, নতুন নির্দেশনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশগত ভারসাম্য দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
