স্পোর্টস ডেস্ক

ডারউইনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের পর বদলে গেছে দ্বিতীয় টেস্টের আবহ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার টেস্ট জিতে স্বাগতিক ক্রিকেটকে বড় ধাক্কা দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যেও বাংলাদেশ দলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ। তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ম্যাকাইয়ে—বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিনের সব সাধারণ টিকিট ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে।

আগামী শনিবার কুইন্সল্যান্ডের ম্যাকাইয়ে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় শুরু হবে দুই ম্যাচের সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট। এই ম্যাচ দিয়েই অস্ট্রেলিয়ার ১২তম টেস্ট ভেন্যু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে ম্যাকাই।

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, এনআরএমএ ইনস্যুরেন্স ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিনের সাধারণ আসনের সব টিকিট বিক্রি শেষ। প্রায় ১০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামটিতে প্রথম টেস্ট আয়োজন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে আগে থেকেই আগ্রহ ছিল। তবে ডারউইনে বাংলাদেশের ৯ উইকেটের জয় সেই আগ্রহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ডারউইনের পর সিরিজ বাঁচানোর লড়াই

টেস্ট ক্রিকেটে র‍্যাংকিং ও ঐতিহ্যের বিচারে দুই দলের ব্যবধান অনেক। কিন্তু ডারউইনে সেই হিসাব ওলটপালট করে দিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।

চার দিনের ম্যাচে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ, ব্যাটিং দৃঢ়তা ও মেহেদী হাসান মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্যের সামনে অস্ট্রেলিয়া কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে। প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদের ৬ উইকেট এবং ম্যাচে ৯ উইকেট বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের ভিত গড়ে দেয়।

ব্যাট হাতে দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেই তানজিদ হাসান তামিম করেন স্মরণীয় সেঞ্চুরি। এরপর নাজমুল হোসেন শান্ত ও মিরাজের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসে বড় লিড পায় বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজের পাঁচ উইকেটের পর মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য পায় সফরকারীরা এবং ৯ উইকেটের জয় নিশ্চিত করে ইতিহাস গড়ে।

২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া সফরে ফিরে প্রথম টেস্টেই এমন হার অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র আলোচনা তৈরি করেছে। ওপেনার জেক ওয়েদারাল্ডকে দ্বিতীয় টেস্টের স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সিরিজে সমতা ফেরানোর চাপ এখন প্যাট কামিন্সদের ওপর।

প্রথম দিনের পর দ্বিতীয় দিনের টিকিটেও বাড়ছে আগ্রহ

অস্ট্রেলিয়ার প্রবাসী ভারতীয় সম্প্রদায়কেন্দ্রিক সাময়িকী দ্য ইন্ডিয়ান সান জানিয়েছে, প্রথম দিনের সাধারণ টিকিটের পাশাপাশি করপোরেট হসপিটালিটি প্যাকেজও বিক্রি হয়ে গেছে। দ্বিতীয় দিনের টিকিটের চাহিদাও বেড়েছে এবং সেগুলোও প্রায় শেষের পথে বলে জানিয়েছে সাময়িকীটি।

দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ দিনের টিকিট অবশ্য এখনও পাওয়া যাচ্ছে। তবে ম্যাচ ঘিরে আগ্রহ যেভাবে বাড়ছে, তাতে টেস্টের প্রথম আয়োজনেই ম্যাকাইয়ে উল্লেখযোগ্য দর্শকসমাগম হতে পারে।

প্রথমবার টেস্টের মঞ্চে ম্যাকাই

গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনা, যা রে মিচেল ওভাল বা হ্যারাপ পার্ক নামেও পরিচিত, এবারই প্রথম পুরুষদের টেস্ট ম্যাচ আয়োজন করছে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে মাঠটির পরিচয় নতুন নয়।

এখানে এর আগে নারীদের বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ওয়ানডে সিরিজও আয়োজন করা হয়েছিল এই মাঠে। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাকাইয়ের আগের উল্লেখযোগ্য স্মৃতি ১৯৯২ বিশ্বকাপের ভারত-শ্রীলঙ্কা ম্যাচ।

স্থানীয় ক্লাব, স্কুল ও আঞ্চলিক ক্রিকেটের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা ম্যাকাইয়ের ক্রিকেট সংস্কৃতি এবার পাচ্ছে নতুন মর্যাদা। বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট আয়োজন শহরটিকে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট মানচিত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে।

দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত বাংলাদেশ

ডারউইনের ঐতিহাসিক জয়ের পর ম্যাকাইয়ে পৌঁছাতে বাংলাদেশ দলকে অবশ্য বেশ ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। ডারউইন থেকে কেয়ার্নস হয়ে ম্যাকাই পৌঁছাতে প্রায় ১২ ঘণ্টার যাত্রা করতে হয়েছে ক্রিকেটারদের।

যাত্রাপথে টাউন্সভিলে উড়োজাহাজের একটি কারিগরি সমস্যার কারণে প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্ব হয়। দীর্ঘ সময় বিমানেই অপেক্ষা করতে হয় দলকে। ভ্রমণক্লান্তির কারণে নির্ধারিত অনুশীলনও বাতিল করেছে টিম ম্যানেজমেন্ট।

ডারউইনের উষ্ণ আবহাওয়া থেকে ম্যাকাইয়ের পরিবেশও বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। রাতের তাপমাত্রা নেমে যাচ্ছে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও ২২ থেকে ২৩ ডিগ্রির মধ্যে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য তাই দ্বিতীয় টেস্ট শুধু অস্ট্রেলিয়ার পাল্টা আক্রমণ সামলানোর ম্যাচ নয়; নতুন আবহাওয়া ও কন্ডিশনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার পরীক্ষাও।

‘তোমাদের কন্ডিশন থেকে এবার আমাদের কন্ডিশনে’

ডারউইনের গরম ও তুলনামূলক পরিচিত পরিবেশে বাংলাদেশ দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলেছে। কিন্তু ম্যাকাইয়ের ঠান্ডা আবহাওয়া ও ভিন্ন কন্ডিশন নিয়ে স্বাগতিকদের আত্মবিশ্বাসও স্পষ্ট।

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট মহলে এখন আলোচনার বিষয়—ডারউইনের হার কি কেবল একটি ব্যতিক্রম, নাকি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের পরিবর্তিত সক্ষমতার প্রতিফলন?

অস্ট্রেলিয়া প্রথম টেস্টের ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া। অন্যদিকে বাংলাদেশ চাইবে ঐতিহাসিক জয়কে এক ম্যাচের সাফল্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সিরিজ জয়ের দিকে এগিয়ে নিতে।

ডারউইনে বাংলাদেশের জয় ছিল বিস্ময়ের। ম্যাকাইয়ে সেই বিস্ময়কে এখন প্রমাণে পরিণত করার সুযোগ শান্তদের সামনে।

প্রথম দিনের সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ায় একটি বিষয় অন্তত স্পষ্ট—ম্যাকাইয়ের অভিষেক টেস্ট আর কেবল নতুন ভেন্যুর উদ্বোধনী ম্যাচ নয়। ডারউইনে বাংলাদেশের দেওয়া ধাক্কার পর এটি এখন সিরিজের সবচেয়ে আলোচিত লড়াই।

এবার বাংলাদেশের সামনে নতুন প্রশ্ন—ডারউইনের রূপকথা কি ম্যাকাইয়েও চলবে, নাকি নিজেদের মাঠে অস্ট্রেলিয়া দেখাবে কেন তারা এখনও টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি?