আলজাজিরার বিশ্লেষণ

আলজাজিরার বিশ্লেষণ ।| আন্তর্জাতিক ডেস্ক

একসময় ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমের বয়ান নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী ছিল মোদির বিজেপি। কিন্তু ‘ককরোচ’ আন্দোলনের উত্থান সেই রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরন বদলে দিচ্ছে কি না, তা নিয়েই এখন নতুন প্রশ্ন উঠেছে।

নয়াদিল্লি: ৪ আগস্ট রাতে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় শহর পাটনার একটি ভোট গণনা কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) গত ১২ বছরের মধ্যে অন্যতম বড় রাজনৈতিক ধাক্কা খায়।

বিহার বিধানসভার ব্যাংকিপুর আসনটি প্রায় তিন দশক ধরে বিজেপির দখলে ছিল। কিন্তু এবার নবগঠিত জন সুরাজ পার্টির প্রার্থী সেই দীর্ঘ আধিপত্যের অবসান ঘটান। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন রাজনৈতিক কৌশলবিদ থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা প্রশান্ত কিশোর। মাত্র কয়েক মাস আগেও এই আসনটি বিজেপির জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীনের দখলে ছিল।

এই পরাজয়ের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের পেছনে ছিল সাত সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন, যা নয়াদিল্লি ছাড়িয়ে ভারতের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল।

এই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। মে মাসে ইনস্টাগ্রামে ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ হিসেবে তুলনা করার পরই এই প্রতীককে নিজেদের প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত করে তরুণেরা।

বিজেপির জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীন প্রচারণার সময় জেন-জি আন্দোলনকারীদের ‘দেশ ভাঙার জন্য নিয়োজিত ভাইরাস ও ককরোচ গ্যাং’ বলে আক্রমণ করেছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিপুরে ভাঙন ধরেছে বিজেপির দীর্ঘদিনের আধিপত্যেই।

এই আকস্মিক নির্বাচনী ফলাফল তাই ভারতের রাজনীতিতে আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক যন্ত্র হিসেবে পরিচিত বিজেপি কি এবার তাদের রাজনৈতিক কৌশল বদলাতে বাধ্য হবে?

তরুণদের কাছে পৌঁছানোর মরিয়া চেষ্টা

জেন-জি আন্দোলনকে বিজেপি যে শুধুই সাময়িক বিরক্তি হিসেবে দেখছে না, তার সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় দলটির প্রতিক্রিয়ায়।

আন্দোলনের তীব্রতার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইনস্টাগ্রামে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে একাধিক সেলফি-ধাঁচের ভিডিও প্রকাশ করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি মন্ত্রিসভার সদস্যদের তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর নির্দেশ দেন। তাঁর পরামর্শ ছিল—তরুণদের কাছে পৌঁছাতে সংবাদ সম্মেলনের চেয়ে ইনস্টাগ্রামের রিলসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশেও বিজেপি জেন-জি তরুণদের কাছে পৌঁছাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের স্কুলে গিয়ে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং করার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

এমনকি একটি ভিডিওতে জিমে তরুণদের সঙ্গে ইন্টারনেটের নানা স্ল্যাং ব্যবহার করে কথোপকথন করতে দেখা যায় একজন বয়স্ক প্রশিক্ষককে। কথোপকথনের একপর্যায়ে আলোচনাকে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি নিয়ে ব্যাপক ঠাট্টা শুরু হয়। অনেকেই মন্তব্য করেন, বিজেপি যেন নিজেদের প্রজন্মকে লক্ষ্য করে প্রচারণার ভাষা তৈরির জন্য তরুণদের ‘ভাড়া’ করেছে।

মোদির আরেকটি ভিডিও ফেসবুক থেকে সাময়িকভাবে উধাও হওয়ার পর ভারতের সংসদীয় তথ্যপ্রযুক্তি কমিটি মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানায়।

নয়াদিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলীর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাব ধরে রাখার এই আকস্মিক প্রচেষ্টা বিজেপির রাজনৈতিক যোগাযোগব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকে প্রকাশ করছে।

তাঁর ভাষায়, একসময় বিজেপি এমন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে পারত, যা দলীয় সমর্থকেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে দিতেন। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের অনেক বার্তাই ‘পরিকল্পিত ও অর্থ ব্যয় করে তৈরি’ বলে মনে হয়।

আলীর মতে, মূলধারার গণমাধ্যমে বিজেপির যোগাযোগব্যবস্থা এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে দলটি আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ তৈরি করতে পারছে না।

শুধু প্রচারণার কৌশল বদলালেই কি হবে?

প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক জিল ভের্নিয়ের মনে করেন, বিজেপির নতুন প্রচারণা মূলত ‘নীতিগত পরিবর্তনের চেয়ে জনমত ও ভাবমূর্তি নিয়ন্ত্রণের লড়াই’।

তাঁর মতে, শিক্ষামন্ত্রী পরিবর্তন হলেও সরকারের মৌলিক নীতিতে কোনো বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। নতুন শিক্ষামন্ত্রীও বিজেপির আদর্শিক পরিসরেরই একজন প্রবীণ নেতা।

তবে এই আন্দোলনে বিজেপির প্রচলিত একটি রাজনৈতিক কৌশল যে বড় ধাক্কা খেয়েছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

বিরোধী আন্দোলনকে ‘দেশবিরোধী’, ‘বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত’ কিংবা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করা বিজেপির পরিচিত কৌশল। ২০১৯-২০ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী আন্দোলনের সময়ও এমন অভিযোগ সামনে এসেছিল।

কিন্তু ‘ককরোচ’ আন্দোলনের ক্ষেত্রে সেই কৌশল কার্যকর হয়নি। এর অন্যতম কারণ, আন্দোলনকারীরা নিজেদের নিয়েই ব্যঙ্গ করেছে এবং আন্দোলনটি ছিল তুলনামূলকভাবে বহুত্ববাদী।

নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলন কিংবা কৃষক আন্দোলনের মতো এটিকে কোনো একটি ধর্ম বা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা যায়নি। বরং বিজেপির সমর্থক হিসেবে পরিচিত উচ্চবর্ণের হিন্দু তরুণদেরও এতে অংশ নিতে দেখা গেছে।

ভের্নিয়েরের ভাষায়, এটি ছিল একটি ‘জাতপাত-নিরপেক্ষ আন্দোলন’।

এর ফলে বিজেপির আরেকটি রাজনৈতিক ধারণাতেও আঘাত লেগেছে—নরেন্দ্র মোদির ওপর তরুণ প্রজন্মের স্বাভাবিক ও প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাব রয়েছে, এমন ধারণা।

ভের্নিয়েরের পর্যবেক্ষণ, আন্দোলনের ফলে ৭৫ বছর বয়সী মোদিকে প্রথমবারের মতো তরুণদের চোখে তাঁর বয়সের সঙ্গে মানানসই একজন প্রবীণ নেতা হিসেবে দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ তিনি তরুণদের কল্পনায় ‘বুমার’ প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছেন।

নির্বাচনী ফলাফলে কি আন্দোলনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে?

আগস্টের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত তিনটি উপনির্বাচনের মধ্যে দুটি আসনে বিজেপি পরাজিত হয়েছে—বিহারের ব্যাংকিপুর এবং মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া। তবে তৃতীয় আসন গুজরাটের মঞ্জালপুরে দলটি স্বাচ্ছন্দ্যেই জয় পেয়েছে।

বিরোধী দলগুলো ব্যাংকিপুরের ফলের সঙ্গে ছাত্র আন্দোলনের সরাসরি সম্পর্ক দেখালেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এ বিষয়ে সতর্ক।

আসিম আলী মনে করেন, একটি উপনির্বাচনের ফলাফল থেকে জাতীয় রাজনীতির বড় সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

ভের্নিয়েরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, উপনির্বাচনে মোট ভোটারের তুলনামূলকভাবে ছোট একটি অংশ ভোট দেয়। ফলে এমন নির্বাচনী ফলাফল দিয়ে বিজেপির সামগ্রিক রাজনৈতিক শক্তি বিচার করা কঠিন।

তাঁর মতে, বিজেপির রাজনৈতিক কাঠামো অতীতেও বড় ধরনের আন্দোলনের পর নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে।

এর উদাহরণ হিসেবে তিনি হরিয়ানার কথা উল্লেখ করেন। সেখানে কৃষকদের দীর্ঘ আন্দোলনের কয়েক বছর পরও বিজেপি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। অর্থাৎ আন্দোলন একটি ইস্যু তৈরি করলেও নির্বাচন শেষ পর্যন্ত অন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর নির্ভর করতে পারে।

তবে পরিবর্তনটি শুধু ভোটের হিসাবে নয়; বরং বিজেপিকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বয়ানে।

এখন যে বয়ানটি তৈরি হচ্ছে, তা হলো—বিজেপির আধিপত্যের পাশাপাশি দলটির বিরুদ্ধে একাধিক নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে।

রাজপথে তরুণদের সঙ্গে ছিলেন এক তরুণ এমপি

নয়াদিল্লির জন্তর মন্তর—যা জেন-জি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল—সেখানে নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন উত্তর প্রদেশের কৌশাম্বী আসনের ২৭ বছর বয়সী সমাজবাদী পার্টির এমপি পুষ্পেন্দ্র সরোজ।

আন্দোলনের শুরুতে কয়েক শ তরুণের উপস্থিতি ধীরে ধীরে কয়েক হাজারে পরিণত হতে দেখেছেন তিনি।

অ্যাক্টিভিস্ট সোনম ওয়াংচুক ২০ দিনের অনশনের পর হাসপাতালে ভর্তি হলে আন্দোলনের ব্যাপ্তি আরও বাড়ে। সরোজের মতে, সরকারের কঠোর অবস্থান এবং দীর্ঘ সময় নীরব থাকার কারণে জনসমর্থন বেড়েছে। বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ এবং ২০ জুলাই দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে।

একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাবেক সেনাসদস্য এমনকি দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদেরও আন্দোলনে যুক্ত হতে দেখা যায়।

সরোজের দাবি, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও তখনই আসে, যখন আন্দোলনের আঙুল সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দিকে উঠতে শুরু করে।

তবে তাঁর মতে, আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতির একটি সহজ কারণও ছিল—‘কেউই শিশুদের মার খেতে দেখতে চায় না।’

‘এটাকে কোনোভাবেই বিজয় বলা যায় না’

আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক তরুণের কাছে বিষয়টি কোনো ব্যঙ্গাত্মক ইনস্টাগ্রাম পেজ কিংবা একজন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) নেত্রী অঞ্জলির মতে, এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

তাঁর ভাষায়, এই আন্দোলনের জন্ম কোনো একটি মন্তব্য কিংবা একটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় হয়নি। গত ১২ বছর ধরে দেশের তরুণদের মধ্যে জমতে থাকা ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরিত হয়েছে।

অঞ্জলির মতে, সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য ও নারীবিদ্বেষী রাজনীতি বন্ধ না হলে এই আন্দোলনকে কোনোভাবেই বিজয় বলা যাবে না।

তাঁর অভিযোগ, আন্দোলন শেষ হওয়ার পরও মুসলিম ও দলিত শিক্ষার্থীরাই প্রথমে গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি ও পুলিশি মামলার শিকার হয়েছেন।

গোয়ায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ উদ্‌যাপনের সময় কারাবন্দী কর্মী উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের সমর্থন করার অভিযোগে দুই তরুণকে পুলিশ আটক করার ঘটনাকেও তিনি একই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন।

ভবিষ্যতে কী করবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’?

আসিম আলী, ভের্নিয়ের ও অঞ্জলি—তিনজনেরই ধারণা, ককরোচ জনতা পার্টি সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করবে—এমন সম্ভাবনা আপাতত কম।

ভের্নিয়েরের মতে, এখন পর্যন্ত নির্বাচনী রাজনীতি থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্তটি কৌশলগতভাবে বুদ্ধিমান। তিনি আম আদমি পার্টির (এএপি) উদাহরণ টেনেছেন। একটি আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক দল হিসেবে উঠে আসা এএপি একসময় বড় সাফল্য পেলেও ক্ষমতায় এক দশক কাটানোর পর অনেক জায়গায় হতাশার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

একটি জাতীয় রাজনৈতিক দল পরিচালনার জন্য বিপুল অর্থ, সংগঠন, কর্মী ও সাংগঠনিক কাঠামো প্রয়োজন। বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তায় থাকা তরুণদের নেতৃত্বাধীন একটি আন্দোলনের পক্ষে তা তৈরি করা সহজ নয়।

তাই ককরোচ আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্ভবত সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে নয়; বরং অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল হওয়ার বদলে এটি একটি শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠী বা চাপ সৃষ্টিকারী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে টিকে থাকতে পারে।

এআইএসএর অঞ্জলিও একই ধরনের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। জন্তর মন্তরে আন্দোলনে সক্রিয় থাকলেও তাঁরা আন্দোলনকে শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চান না। বরং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যাম্পাসে সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক বক্তব্য গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

এই প্রতিবেদনের বিষয়ে আল-জাজিরা বিজেপির ১৮ জন জাতীয় মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ক্ষমতা ও রাজনৈতিক বৈধতার ব্যবধান

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই।

আসিম আলীর ধারণা, ককরোচ আন্দোলনের চাপে বিজেপি তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসে চাকরি ও শিক্ষাকে প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু করবে—এমন সম্ভাবনা খুব কম।

বরং তাঁর আশঙ্কা, বিজেপি ধর্মীয় পরিচয়কে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে পারে, যাতে নির্বাচনী রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণই প্রধান ইস্যু হয়ে থাকে।

তবে ভের্নিয়েরের মতে, বিজেপির প্রকৃত রাজনৈতিক শক্তি হয়তো এই আন্দোলনে তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বরং প্রশ্ন উঠেছে দলটির রাজনৈতিক বৈধতা ও জনগ্রহণযোগ্যতা নিয়ে

নির্বাচনী সাফল্য, বিরোধী দলের নেতাদের দলবদল করানো এবং বিপুল অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক সামর্থ্যের কারণে বিজেপি এখনও ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি।

কিন্তু আন্দোলনটি যে জায়গায় আঘাত করেছে, সেটি আরও গভীর।

তা হলো—বিজেপির বিপুল ক্ষমতার সঙ্গে নাগরিকদের সেই ক্ষমতা মেনে নেওয়ার মানসিকতার মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্ব।

একটি নির্বাচনে জয় পাওয়া, একটি উপনির্বাচনে পরাজয় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আকর্ষণীয় ভিডিও প্রকাশ—কোনোটিই সেই দূরত্ব সহজে মুছে দিতে পারে না।

কারণ, ‘ককরোচ’ আন্দোলন দেখিয়েছে, তরুণদের একটি অংশ এখন শুধু সরকারের প্রচার শুনতে চায় না; তারা সরকারের বক্তব্যকে যাচাই করতে চায়, প্রশ্ন করতে চায় এবং প্রয়োজন হলে ব্যঙ্গের মাধ্যমে ক্ষমতার ভাষাকেই উল্টে দিতে চায়।

ভারতের রাজনীতিতে তাই এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হয়তো কোনো আসনের ফলাফল কিংবা কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগে নয়। এর গুরুত্ব হলো রাজনৈতিক যোগাযোগের পরিবর্তিত বাস্তবতায়।

বিজেপি এখনও ক্ষমতাবান—এ নিয়ে বড় কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ক্ষমতা আর গ্রহণযোগ্যতা যে একই জিনিস নয়, ‘ককরোচ’ আন্দোলন সেই পার্থক্যটি নতুন করে সামনে এনেছে।

আর সেই ব্যবধান কতটা বাড়বে, নাকি বিজেপি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের মাধ্যমে তা কমিয়ে আনতে পারবে—ভারতের আগামী দিনের রাজনীতিতে সম্ভবত সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।