লেখক: ফরহাদুল আলম
এস এম সুলতান: মানুষ, মাটি ও জীবনশক্তির অনন্য শিল্পভাষা
শিল্পী এস এম সুলতানের জীবন ছিল নদীর মতো- অসংখ্য বাঁক, অজানা যাত্রা, দেশ থেকে দেশান্তর, আবার শেষ পর্যন্ত নিজের মাটিতে ফিরে আসা। আন্তর্জাতিক শিল্পজগতের আলো, খ্যাতি ও সম্ভাবনাময় জীবন পেছনে ফেলে তিনি ফিরে এসেছিলেন নড়াইলের মানুষের কাছে। কারণ তাঁর শিল্পের কেন্দ্র ছিল মানুষ; আর সেই মানুষের সবচেয়ে গভীর পরিচয় ছিল মাটি, শ্রম ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
বাংলার শিল্প-ইতিহাসে কিছু নাম শুধু শিল্পী হিসেবে উচ্চারিত হয় না; তারা হয়ে ওঠেন একেকটি স্বতন্ত্র জগৎ। এস এম সুলতান তেমনই এক শিল্পী। তাঁর পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান, শৈশবের নাম লাল মিয়া। কিন্তু শিল্পের জগতে তিনি শুধু একজন চিত্রকর নন- তিনি ছিলেন এক বোহেমিয়ান পথিক, এক বৈরাগী মানুষ, এক জীবনদ্রষ্টা এবং বাংলার শ্রমজীবী মানুষের অন্তর্গত শক্তির শিল্পরূপকার।
তাঁর জীবন কখনো কলকাতায়, কখনো কাশ্মীরে, কখনো লাহোর বা করাচিতে, আবার কখনো ইউরোপ-আমেরিকার শিল্পজগতে ঘুরে বেড়িয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে অর্থবহ গন্তব্য ছিল নড়াইল।
এই ফিরে আসা কেবল একজন মানুষের জন্মভূমিতে প্রত্যাবর্তন ছিল না। এটি ছিল এক শিল্পীর নিজের শিল্পদর্শনের কাছে ফিরে আসা।
সুলতান বুঝেছিলেন, আন্তর্জাতিক শিল্পবাজারে জায়গা করে নেওয়ার চেয়েও বড় কাজ আছে—নিজের মানুষের জীবনকে এমন এক শিল্পভাষায় তুলে ধরা, যেখানে তাদের দারিদ্র্য নয়, দৃশ্যমান হবে তাদের শক্তি; তাদের অসহায়ত্ব নয়, প্রকাশ পাবে তাদের বেঁচে থাকার অদম্য ক্ষমতা।

কৃষক তাঁর ছবির বিষয় নয়, শক্তির প্রতীক
এস এম সুলতানের শিল্পের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য তাঁর কৃষক। কিন্তু তাঁর ক্যানভাসের কৃষক বাস্তব জীবনের ক্ষীণকায়, অপুষ্ট শরীরের কৃষকের হুবহু প্রতিকৃতি নয়।
বরং সেখানে দেখা যায় অস্বাভাবিক শক্তিশালী, পেশিবহুল, প্রায় পৌরাণিক অবয়বের মানুষ।
এই জায়গাটিই সুলতানের শিল্পকে আলাদা করে।
বাস্তবে যে কৃষক ভূমির মালিক নয়, অর্থনৈতিক শোষণের শিকার, অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকে—সুলতানের ক্যানভাসে সেই মানুষই হয়ে ওঠে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা এক মহাশক্তি।
তিনি শরীরকে বিকৃত করেননি শুধু শৈল্পিক কৌশল হিসেবে। তাঁর এই অ্যানাটমিক্যাল ডিস্টরশন ছিল এক ধরনের রূপক।
কৃষকের পেশিবহুল শরীর যেন বলছে—এই মানুষটি দুর্বল হতে পারে, দরিদ্র হতে পারে, কিন্তু তার জীবনশক্তি দুর্বল নয়।
দিনের পর দিন প্রকৃতি, দারিদ্র্য, শোষণ ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে লড়াই করেও যে মানুষটি মাঠে ফিরে যায়, বীজ বোনে, ফসল ফলায়—সুলতান সেই শক্তিকেই দৃশ্যমান করেছেন।
এখানেই তাঁর শিল্পের রাজনৈতিকতা।
তিনি হয়তো রাজনৈতিক স্লোগান আঁকেননি। কিন্তু তাঁর কৃষক নিজেই এক রাজনৈতিক বক্তব্য। কারণ সুলতানের ক্যানভাস প্রশ্ন তোলে—যে মানুষ মাটিকে উর্বর করে, খাদ্য উৎপাদন করে, সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখে, তার জীবনে এত অনিশ্চয়তা কেন?

দারিদ্র্যের ছবি নয়, মানুষের মর্যাদার ছবি
বাংলার কৃষককে নিয়ে শিল্পচর্চা নতুন কিছু ছিল না। কিন্তু সুলতানের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন।
তিনি কৃষককে করুণার পাত্র বানাননি।
তাঁর ছবির মানুষ দর্শকের কাছে সহানুভূতি ভিক্ষা করে না; বরং দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শক্তির পরিচয় দেয়। তাদের শরীর বড়, উপস্থিতি বিশাল, প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গভীর।
এই কারণেই সুলতানের শিল্পে গ্রামীণ মানুষ কেবল একটি সামাজিক শ্রেণি নয়—তারা সভ্যতার মূল শক্তি।
কৃষক, নারী, জেলে, শিশু, পশুপাখি, নদী, চর, নৌকা, ফসলের মাঠ—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর ক্যানভাসে তৈরি হয় এক সম্পূর্ণ জীবনজগৎ।
এই জগতে মানুষ প্রকৃতির বাইরে নয়।
মানুষ মাটির অংশ, নদীর অংশ, ঋতুর অংশ।
আজকের দ্রুত নগরায়ন, পরিবেশবিচ্ছিন্ন জীবন এবং ভোগবাদী সংস্কৃতির সময়ে সুলতানের এই শিল্পদর্শন আরও নতুন অর্থ নিয়ে সামনে আসে। তাঁর ছবিগুলো যেন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সভ্যতা যত আধুনিকই হোক, মানুষের শেষ আশ্রয় মাটি।
আধুনিকতার সঙ্গে তাঁর নীরব বিতর্ক
সুলতানকে বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তিনি কি আধুনিক শিল্পী?
প্রচলিত ইউরোপকেন্দ্রিক আধুনিকতার সংজ্ঞা দিয়ে বিচার করলে তাঁকে অনেক সময় সহজে কোনো নির্দিষ্ট ঘরে রাখা যায় না। তিনি পশ্চিমা শিল্পধারার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, বিদেশে ঘুরেছেন, আন্তর্জাতিক শিল্পজগতের সঙ্গে যোগাযোগও ছিল তাঁর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সেই পথের অনুগামী হয়ে ওঠেননি।
তিনি আধুনিকতাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কি না, সেটি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট যে, তাঁর কাছে আধুনিকতা কেবল নতুন আঙ্গিক, বিমূর্ততা কিংবা ফর্মের পরীক্ষানিরীক্ষার নাম ছিল না।
তাঁর শিল্পে আধুনিকতা ছিল মানুষের শক্তিকে নতুনভাবে দেখা।
শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সুলতানের শিল্প নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মানুষের ভেতরের শক্তির উত্থান এবং ঔপনিবেশিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে তাঁর শিল্পভাষার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন।
সুলতানের কাছে ইউরোপীয় নগরসভ্যতার অনুকরণ নয়, বরং মানুষের কর্মজীবনই ছিল শিল্পের প্রধান ক্ষেত্র।
এই জায়গায় তাঁর শিল্পকে শুধু ‘গ্রামীণ শিল্প’ বলে সীমাবদ্ধ করলে ভুল হবে।
কারণ তাঁর গ্রামের মানুষ আসলে একটি বৃহত্তর মানবিক দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে।
তিনি কোনো ধারার অনুসারী নন
এস এম সুলতানের শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তাঁর স্বতন্ত্রতা।
তিনি কোনো প্রতিষ্ঠিত ধারার নিরাপদ আশ্রয়ে থাকেননি। তাঁর ছবিতে লোকজ প্রভাব আছে, ভারতীয় শিল্পঐতিহ্যের ছাপ আছে, পশ্চিমা শিল্প-অভিজ্ঞতার প্রতিধ্বনিও খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর শিল্পকে পুরোপুরি কোনো একটি ধারায় বন্দী করা যায় না।
আহমদ ছফার বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—সুলতানের যেন কোনো পূর্বসূরি নেই, নেই কোনো উত্তরসূরিও।
এই মন্তব্যের মধ্যে অতিরঞ্জন থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর স্বতন্ত্রতার সত্যটিকে অস্বীকার করা কঠিন।
সুলতানের শিল্পভাষা তাঁর নিজের জীবন থেকেই জন্ম নিয়েছে।
তাঁর রেখা কখনো দ্রুত, কখনো অস্থির; তাঁর রং উজ্জ্বল, কখনো বিস্ফোরক; তাঁর মানুষের শরীর বাস্তবতার নিয়ম মানে না। অথচ সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় এক এমন দৃশ্যভাষা, যা দেখলেই বোঝা যায়—এটি সুলতান।
এটাই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য।

বোহেমিয়ান জীবন: স্বাধীনতা, না কি অস্থিরতা?
সুলতানের জীবন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর বোহেমিয়ান চরিত্র এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
তিনি ছিলেন নিয়মের বাইরে থাকা মানুষ। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিন বাঁধা থাকতে পারেননি। কলকাতার আর্ট কলেজে তাঁর পড়াশোনাও দীর্ঘ হয়নি। জীবনের বিভিন্ন সময় তিনি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরেছেন, কখনো যাযাবর মানুষের সঙ্গে থেকেছেন, কখনো পাহাড়ে, কখনো শহরে।
এই জীবনযাপন তাঁকে রহস্যময় করে তুলেছিল।
কিন্তু একই সঙ্গে এখানেই রয়েছে তাঁর শিল্পীসত্তার একটি জটিল দিক।
একদিকে এই অস্থিরতাই তাঁকে স্বাধীন রেখেছে। তিনি প্রতিষ্ঠিত শিল্পবাজারের নিয়মে নিজেকে বাঁধেননি। অন্যদিকে তাঁর এই উদাসীনতার কারণে তাঁর জীবনের বহু শিল্পকর্ম যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি।
বিশেষ করে চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের তাঁর বহু কাজের সন্ধান পাওয়া যায় না বা সেগুলোর পূর্ণ নথি নেই।
এটি শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসেরও অপূরণীয় ক্ষতি।
সুলতান তাই আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন রেখে যান—আমরা কি আমাদের শিল্পীদের কাজ, দলিল ও স্মৃতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করি?
অদেখা সুলতান এবং রেখার বিস্ময়
সুলতানের চিত্রকর্ম নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সাধারণত তাঁর পেশিবহুল কৃষকই সবচেয়ে বেশি সামনে আসে। কিন্তু তাঁর রেখাচিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে আরেক সুলতানকে।
চারকোল, পেনসিল, কলম ও জলরঙে করা তাঁর বহু কাজ দ্রুত পর্যবেক্ষণের ফল। সেখানে অসম্পূর্ণতা আছে, খসড়ার স্বতঃস্ফূর্ততা আছে, কিন্তু সেই অসম্পূর্ণতার মধ্যেও আছে গঠনশক্তি।
নারী, পুরুষ, প্রকৃতি, পশুপাখি ও লতাপাতার এসব রেখাচিত্রে পরবর্তী সময়ের সুলতানের বৃহৎ অবয়বের পূর্বাভাস পাওয়া যায়।
মনে হয়, তাঁর বিখ্যাত পেশিবহুল মানুষের জন্মের আগে রেখার মধ্যে তিনি তাদের শরীর খুঁজছিলেন।
এই রেখাচিত্রগুলো আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয়—সুলতানকে শুধু কয়েকটি বহুল পরিচিত ছবির মাধ্যমে বিচার করলে তাঁর শিল্পীসত্তার বড় অংশ অদেখাই থেকে যায়।
তাঁর জীবন ও শিল্প নিয়ে আরও গবেষণা, ক্যাটালগিং এবং আর্কাইভ নির্মাণ তাই জরুরি।
আন্তর্জাতিক শিল্পজগত থেকে নড়াইলে ফিরে আসা
সুলতানের জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়গুলোর একটি তাঁর বিদেশযাত্রা ও আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনের সঙ্গে সংযোগ।
কলকাতা থেকে শুরু করে ভারত ভ্রমণ, কাশ্মীর, শিমলা, লাহোর, করাচি—তাঁর জীবন ছিল ক্রমাগত চলার মধ্যে।
পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপেও তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়। আন্তর্জাতিক শিল্পজগতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় তাঁকে চাইলে ভিন্ন এক জীবন দিতে পারত।
তিনি হয়তো আন্তর্জাতিক শিল্পবাজারে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করতে পারতেন।
কিন্তু তিনি ফিরে এলেন।
নড়াইলে।
এই সিদ্ধান্তকে শুধু রোমান্টিক করে দেখলে ভুল হবে। কারণ তাঁর ফিরে আসার মধ্যে ছিল শিল্পের সামাজিক ভূমিকা নিয়ে এক গভীর ভাবনা।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শিল্প কেবল গ্যালারির দেয়ালে ঝোলানোর বস্তু নয়। শিল্প মানুষের চেতনাকে বদলাতে পারে।
আর সেই বিশ্বাস থেকেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে মানবিক প্রকল্পগুলোর জন্ম।
শিশুস্বর্গ: ভবিষ্যৎ মানুষ তৈরির স্বপ্ন
সুলতানের শিল্পদর্শনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়গুলোর একটি শিশুদের নিয়ে তাঁর কাজ।
নড়াইলে তিনি গড়ে তুলেছিলেন শিশুস্বর্গ—যেখানে শিশুর সৃজনশীলতা, কল্পনা ও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্প মানুষের ভেতরের সৌন্দর্যবোধকে জাগিয়ে তোলে।
শিশু যদি ছবি আঁকে, ফুল দেখে, গাছ চিনে, পাখি ও প্রাণীর সঙ্গে পরিচিত হয়—তাহলে তার ভেতরে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা তৈরি হবে।
তাঁর এই চিন্তা আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।
বর্তমান সময়ে শিশুদের শিক্ষা যখন ক্রমশ পরীক্ষার ফল, প্রতিযোগিতা ও প্রযুক্তিনির্ভরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, তখন সুলতানের শিল্পশিক্ষার ধারণা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
শিক্ষা কি শুধু কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি?
নাকি শিক্ষা মানুষের ভেতরের মানুষটিকেও গড়ে তুলবে?
সুলতানের কাছে দ্বিতীয় প্রশ্নটিই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি শিশুদের শুধু ভবিষ্যতের কর্মী হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন ভবিষ্যতের মানুষ হিসেবে।

নারীও তাঁর সংগ্রামের অংশ
সুলতানের শিল্পে নারী কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়।
তাঁর নারীরাও শক্তিশালী।
তারা শ্রমজীবী, তারা প্রকৃতির অংশ, তারা সংগ্রামের সঙ্গী।
এখানে নারীকে নিষ্ক্রিয় অবয়ব হিসেবে দেখা হয়নি। কৃষিজীবনের মতোই নারীও তাঁর শিল্পে সৃষ্টির শক্তির অংশ।
তবে এখানেও সমালোচনার জায়গা রয়েছে। আধুনিক নারীবাদী শিল্পসমালোচনার দৃষ্টিতে সুলতানের নারী-উপস্থাপন নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে—এই শক্তিশালী দেহ কি নারীর নিজের পরিচয়ের প্রতিফলন, নাকি শিল্পীর নির্মিত এক প্রতীকী ধারণা?
এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ মহান শিল্পীর কাজও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। বরং নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁর কাজকে পাঠ করাই তাঁর শিল্পকে জীবন্ত রাখে।
একাত্তর এবং শিল্পীর বদলে যাওয়া দৃষ্টি
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতীয় জাগরণ সুলতানের শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
তাঁর ছবিতে যে মানুষ আগে থেকেই মাটির সঙ্গে লড়াই করছিল, স্বাধীনতার পর সেই মানুষের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক অর্থ যুক্ত হয়।
ভূমি, অধিকার, সংগ্রাম, মানুষের আত্মমর্যাদা—এসব বিষয় তাঁর শিল্পে আরও তীব্রভাবে উপস্থিত হতে থাকে।
‘চর দখল’, ‘ক্ষেত দখল’ কিংবা কৃষকজীবনকেন্দ্রিক তাঁর বিভিন্ন কাজ শুধু দৃশ্যচিত্র নয়; এগুলো ভূমির মালিকানা এবং মানুষের অধিকার নিয়েও ভাবতে শেখায়।
এই জায়গায় সুলতানের শিল্পকে কেবল নস্টালজিক গ্রামবাংলার ছবি হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
তাঁর গ্রাম ছিল সংগ্রামের গ্রাম।
তাঁর কৃষক ছিল অধিকারহীন মানুষের শক্তির প্রতীক।
সুলতানের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার
১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলে জন্ম নেওয়া এস এম সুলতান ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। জীবদ্দশায় তিনি একুশে পদকসহ বিভিন্ন স্বীকৃতি পেয়েছেন।
কিন্তু কোনো পুরস্কার দিয়ে তাঁর গুরুত্ব পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।
সুলতানের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্ভবত তাঁর এই শিক্ষা—শিল্পের কেন্দ্র হতে পারে সেই মানুষ, যাকে সমাজের কেন্দ্র বলে মনে করা হয় না।
তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন কৃষকের শরীরও মহাকাব্যের বিষয় হতে পারে।
একটি গরুর পেশিও শিল্পের ভাষা হতে পারে।
একজন নারীর শ্রমও সৌন্দর্যের অংশ হতে পারে।
একটি শিশুর আঁকিবুঁকিও ভবিষ্যতের সমাজ নির্মাণের বীজ হতে পারে।
তিনি আমাদের চোখকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছেন।
সংরক্ষণ ও গবেষণা: এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ
সুলতানকে নিয়ে আবেগ আছে, কিংবদন্তি আছে, অসংখ্য গল্প আছে। কিন্তু এখন প্রয়োজন আরও সুসংগঠিত গবেষণা।
তাঁর শিল্পকর্মের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কোথায়?
কোন কাজ কোন সময়ে তৈরি হয়েছে?
কোনগুলো বিদেশে আছে?
কোনগুলো ব্যক্তিগত সংগ্রহে?
কোন কাজের সত্যতা যাচাই করা হয়েছে?
তাঁর হারিয়ে যাওয়া শিল্পকর্মের অনুসন্ধানে কী ধরনের গবেষণা চলছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
শুধু জন্মবার্ষিকী বা মৃত্যুবার্ষিকীতে সুলতানকে স্মরণ করলেই তাঁর প্রতি দায়িত্ব শেষ হয় না।
তাঁর কাজের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল আর্কাইভ, গবেষণা প্রকল্প, ক্যাটালগ রেইজোনে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর শিল্পকে নতুন করে উপস্থাপনের উদ্যোগ প্রয়োজন।
কারণ সুলতান শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নন; তিনি দক্ষিণ এশিয়ার শিল্প-ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র শিল্পভাষার নির্মাতা।
শেষ কথা: যে মানুষটি মাটির কাছে ফিরে এসেছিলেন
এস এম সুলতানের জীবনকে হয়তো সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় তাঁর ফিরে আসার গল্প দিয়ে।
তিনি পৃথিবী দেখেছিলেন।
শহর দেখেছিলেন।
খ্যাতির সম্ভাবনা দেখেছিলেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নিয়েছিলেন মাটি।
কারণ তিনি জানতেন, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো তার আকাশছোঁয়া স্বপ্নে নয়; তার শিকড়ে।
তাই তাঁর ক্যানভাসে কৃষকের শরীর এত বড়।
তাই তাঁর মানুষগুলো এত শক্তিশালী।
তাই তাঁর প্রকৃতি শুধু পটভূমি নয়, জীবনের অংশ।
সুলতান আসলে এমন এক শিল্পী, যিনি দুর্বল মানুষের মধ্যে শক্তি দেখেছেন, দরিদ্র মানুষের মধ্যে মর্যাদা দেখেছেন এবং সাধারণ জীবনের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন অসাধারণ মহিমা।
আজকের সময়ে, যখন আমরা সাফল্যকে প্রায়ই অর্থ, খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠানের মাপকাঠিতে বিচার করি, তখন সুলতানের জীবন অন্য এক প্রশ্ন সামনে আনে—
মানুষের সত্যিকারের সাফল্য কি কেবল সে কত দূর গেল, নাকি শেষ পর্যন্ত সে কার কাছে ফিরে এল?
এস এম সুলতান অনেক দূর গিয়েছিলেন।
কিন্তু তাঁর শিল্পের সবচেয়ে বড় যাত্রা শেষ হয়েছিল বাংলার মাটিতে ফিরে এসে।
আর সেখান থেকেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন অমর।
লেখক: ফরহাদুল আলম সবুজ
চিত্রশিল্পী ও রাজনীতিবিদ
