নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনের অবসান ঘটে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের বিস্তার, দেশজুড়ে সংঘর্ষ এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।

আন্দোলনের পটভূমি

আন্দোলনের সূচনা হয় সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল-সংক্রান্ত আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে। শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে তা সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়।

আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংঘর্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান এবং সহিংসতার ঘটনা দেশজুড়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে কর্মসূচির পরিধি বাড়িয়ে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা করা হয়।

৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ

৫ আগস্ট সকালে কারফিউ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।

দিনের একপর্যায়ে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং দেশত্যাগ করেন। এরপর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের বিজয় মিছিল ও উদ্‌যাপন দেখা যায়। গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায়ও মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

হতাহত ও বিচারিক কার্যক্রম

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের ঘটনায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। ট্রাইব্যুনালের তথ্যমতে, হাজারো মানুষ প্রাণ হারান, ২৩ হাজারের বেশি আহত হন এবং শত শত মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারান বা স্থায়ীভাবে আহত হন।

এই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে কয়েকটি মামলায় রায় ঘোষণা করেছে এবং আরও বেশ কিছু মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সম্প্রতি বলেন, জুলাই-আগস্টের ঘটনায় দায়ীদের বিচারের লক্ষ্যে ট্রাইব্যুনাল কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং বিচারাধীন মামলাগুলোরও নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার টানা চার মেয়াদ রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এ সময় অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিরোধী দলগুলো নির্বাচনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, অন্যদিকে সরকার সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গুম, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক মামলা এবং বিরোধী দলের কর্মসূচি ঘিরেও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও বিতর্ক চলেছে।

আন্দোলনের স্লোগান ও জনসম্পৃক্ততা

জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে বিভিন্ন স্লোগান ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পায়। কোটা সংস্কারের দাবির পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে সরকারবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান আন্দোলনকারীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব স্লোগান আন্দোলনের সংগঠন, জনসম্পৃক্ততা এবং প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলন হিসেবে বিবেচিত হবে। এর প্রভাব দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে চলমান আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে প্রতিফলিত হতে পারে।

৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের মূল্যায়ন ভিন্ন হলেও, দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।