কলোসিয়াম এর ইতিহাস


কলোসিয়াম (Colosseum) ইতালির রোমে অবস্থিত। 

ভ্রমনকারীদের তালিকায় জীবনে কমপক্ষে একবার যেতে হবে বা দেখতে হবে এমন স্থানের মধ্যে রোম কলিজিয়াম একটি। প্রায় দুই হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে এমন একটি স্থাপত্যকর্ম এবং এটি একটি অত্যন্ত বিশালাকার এবং আকর্ষণীয়। যার সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে, যা একাধিক চলচ্চিত্র এবং ডকুমেন্টারিতে চিত্রিত হয়েছে, এই ইতালিয়ান স্মৃতিস্তম্ভটি সম্পর্কে অনেক কিছুই আমাদের অজানা।

এই কলসিয়াম, ফ্লাভিয়ান অ্যাম্ফিথিয়েটার হিসাবেও পরিচিত।

ভেস্পাসিয়ানোর আদেশের অধীনে যেখানে Nero’s lake নিরো’র হ্রদ ছিল 70 AD এর মধ্যে নির্মাণ শুরু হয়েছিল।

ভেসপাসিয়ান (৯-৭৯ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন ফ্ল্যাভিয়ান রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং ৬৯-৭৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রোমান সম্রাট নিরোর মৃত্যুর পর গৃহযুদ্ধ (‘চার সম্রাটের বছর’) অবসান ঘটিয়ে তিনি আর্থিক সংস্কার, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং বিখ্যাত কলোসিয়াম নির্মাণ শুরু করেন । তিনি অশ্বারোহী পরিবার থেকে উঠে আসা প্রথম রোমান সম্রাট ছিলেন।

এর বর্তমান নামটি এসেছে নেরোর কলসাস, একটি মূর্তি যা নিকটে ছিল এবং এটি আজ সংরক্ষিত নেই। এটি মূলত ডোমাস অরিয়ার উপরে নির্মিত হয়েছিল, নেরো লেকে বালিতে ভরাট করে।

এটির নির্মাণের কারণ সম্পর্কে অনেকগুলি অনুমান করা যায়, এবং ধারণা করা হয় যে রোমান বিজয়ের পরে শহরের সেই এলাকা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার একটি জনপ্রিয় পদক্ষেপ হিসেবে এটা নির্মাণ করা হয় যা নিরো তার নিজের ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ করেছিলেন।

রোমান কলোসিয়াম: স্থাপত্য, ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা

রোমান কলোসিয়ামের অ্যাম্ফিথিয়েটার কাঠামোটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন ধারণার ওপর নির্মিত এবং এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের বৃহত্তম অ্যাম্ফিথিয়েটার। এর ভেতরের প্রধান দুটি অংশ ছিল অ্যারেনা (Arena) এবং হাইপোজিয়াম (Hypogeum)

অ্যারেনা ও হাইপোজিয়াম

অ্যারেনা ছিল মূল খেলার মাঠ—ডিম্বাকৃতি একটি অঙ্গন, যেখানে কাঠের প্ল্যাটফর্মের ওপর বালি বিছিয়ে গ্ল্যাডিয়েটর যুদ্ধ, জনসম্মুখে শাস্তি কার্যকর এবং বিভিন্ন প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হতো।
এর নিচে অবস্থিত ছিল হাইপোজিয়াম, যা সুড়ঙ্গ, কক্ষ ও যান্ত্রিক কাঠামোর একটি জটিল নেটওয়ার্ক। এখানে গ্ল্যাডিয়েটর, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও বন্য প্রাণীদের অ্যারেনায় ওঠার আগ পর্যন্ত রাখা হতো। এই অংশে উন্নত নিকাশী ব্যবস্থা ছিল, যাতে পানি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া যায়। ঐতিহাসিকভাবে ধারণা করা হয়, নওমাকিয়া (নৌযুদ্ধের অনুকরণমূলক প্রদর্শনী) আয়োজনের পর পানি নিষ্কাশনের জন্য এই ব্যবস্থা বিশেষভাবে কার্যকর ছিল।

দর্শক আসন ও সামাজিক বিভাজন

অ্যাম্ফিথিয়েটারের দর্শকাসন বা কাভেয়া (Cavea) অংশটি ছিল পডিয়ামসহ বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত। এখানে সমাজের মর্যাদা অনুযায়ী আসন নির্ধারণ করা হতো—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিচের সারিতে বসতেন।

বমিটোরিয়া: দ্রুত প্রবেশ ও প্রস্থান ব্যবস্থা

আজও বিস্ময় জাগায় কলোসিয়ামের তথাকথিত বমিটোরিয়া (Vomitoria)—এগুলো ছিল প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য ব্যবহৃত প্রশস্ত করিডোর ও বহির্গমন পথ। এর মাধ্যমে খুব অল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক দর্শক বেরিয়ে যেতে পারত। ধারণা করা হয়, মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই প্রায় ৫০,০০০ দর্শক কলোসিয়াম ত্যাগ করতে পারত। আধুনিক অনেক স্টেডিয়ামও আজ পর্যন্ত এই দক্ষতার সমতুল্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি।

রোমান কলোসিয়ামের বহিরাংশ

কলোসিয়ামের বহিরাংশে চার তলা বিশিষ্ট সুপারইমপোজড (একটির ওপর আরেকটি) ফ্যাসাদ দেখা যায়, যেখানে কলাম ও খিলান (আর্চ) ব্যবহৃত হয়েছে এবং সর্বোচ্চ স্তরটি আংশিকভাবে বদ্ধ। এই নকশা পুরো কাঠামোকে হালকা ও ভারসাম্যপূর্ণ সৌন্দর্য দিয়েছে।

প্রতিটি তলায় ভিন্ন ভিন্ন স্থাপত্যশৈলী ব্যবহৃত হয়েছে, যা রোমান স্থাপত্যে তখন প্রচলিত ছিল। নিচ থেকে ওপরের দিকে ক্রমানুসারে টাস্কান, আয়নিককরিন্থিয়ান শৈলী দেখা যায়। সর্বোচ্চ অংশে অলংকরণ হিসেবে মূর্তি স্থাপনের ব্যবস্থা ছিল।

ভেলারিয়াম (Velarium)

কলোসিয়ামের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল ভেলারিয়াম, যা আজ আর সংরক্ষিত নেই। এটি ছিল একটি বিশাল কাপড়ের ছাউনি, যা দর্শকদের সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা করত। কাঠের খুঁটি ও দড়ির সাহায্যে এটি স্থাপন করা হতো। প্রথমদিকে পাল ব্যবহার করা হলেও পরে হালকা লিনেন কাপড় ব্যবহৃত হয়। মোট প্রায় কাঠের মাস্ট (mast) বা খুঁটি ছিল, যা প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা আলাদা অংশ ঢাকার সুযোগ দিত।

কলোসিয়াম (Colosseum), যা ‘ফ্ল্যাভিয়ান অ্যাম্ফিথিয়েটার’ নামেও পরিচিত, বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে এর সমৃদ্ধ ইতিহাসের প্রধান পর্যায়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো: 

নির্মাণ ও প্রারম্ভিক ইতিহাস (৭০-৮২ খ্রিষ্টাব্দ) 

  • নির্মাণকাল: কলোসিয়ামের নির্মাণ কাজ শুরু হয় সম্রাট ভেসপাসিয়ানের আমলে আনুমানিক ৭০-৭২ খ্রিষ্টাব্দে।
  • উদ্বোধন: ৮০ খ্রিষ্টাব্দে ভেসপাসিয়ানের পুত্র সম্রাট টাইটাস ১০০ দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এর উদ্বোধন করেন।
  • পরিপূর্ণতা: সম্রাট ডোমিশিয়ান ৮২ খ্রিষ্টাব্দে এর চতুর্থ তলা এবং মাটির নিচে বিশেষ সুড়ঙ্গ পথ (হাইপোজিয়াম) যুক্ত করে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। এটি নির্মাণে প্রধানত পাথর, কংক্রিট এবং হাজার হাজার শ্রমিকের শ্রম ব্যবহার করা হয়েছিল। 

ব্যবহারের উদ্দেশ্য

  • বিনোদন: এটি মূলত গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই, বন্য পশুর শিকার, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা এবং বিখ্যাত যুদ্ধের পুনরভিনয় দেখানোর জন্য ব্যবহৃত হতো।
  • ধারণক্ষমতা: কলোসিয়ামে প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৮০,০০০ দর্শক একসাথে খেলা উপভোগ করতে পারত । রোমান নাগরিকদের জন্য এই বিনোদন ছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। 

পতন ও ধ্বংসের ইতিহাস

  • প্রাকৃতিক বিপর্যয়: ২১৮ খ্রিষ্টাব্দে বজ্রপাত এবং পরবর্তীতে একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্পের কারণে কলোসিয়াম ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • পরিত্যক্ত হওয়া: খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে এখানে গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই বন্ধ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে স্থাপনাটি পরিত্যক্ত হয় । মধ্যযুগে এটি দুর্গ, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং পাথর সংগ্রহের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল । 

আধুনিক অবস্থা ও সংস্কার

  • ঐতিহ্যবাহী স্বীকৃতি: ১৯০৮ সালে এটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা লাভ করে এবং ২০০৭ সালে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম সপ্তম আশ্চর্যের একটি হিসেবে নির্বাচিত হয় ।
  • বর্তমান সংস্কার: ২০২৬ সাল নাগাদ কলোসিয়ামের মূল কাঠামো টিকিয়ে রাখতে ইতালীয় সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল বা হাইপোজিয়ামের সংস্কার এবং দর্শনার্থীদের জন্য নতুন কাঠের মেঝে নির্মাণের প্রকল্প, যা পর্যটকদের প্রাচীন গ্ল্যাডিয়েটরদের মতো অভিজ্ঞতা প্রদান করে । 

বর্তমানে রোমান কলোসিয়াম ইতালির অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ, যা প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন দর্শনার্থীকে আকৃষ্ট করে। ১৯৮০ সালে এটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এছাড়া ২০০৭ সালের জুলাই মাসে এটি আধুনিক বিশ্বের নতুন সাতটি আশ্চর্যের একটি হিসেবে নির্বাচিত হয়।

আজ কলোসিয়াম দর্শনের জন্য টিকিট ব্যবস্থা চালু রয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৮:৩০টায় এটি দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকিটের মূল্য প্রায় ১২ ইউরো। ভিড় এড়াতে সকালে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টিকিট সংগ্রহ করাই উত্তম।


আরেকটি সুবিধাজনক উপায় হলো রোমা পাস ব্যবহার করা, যার মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন আকর্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভে ছাড় পাওয়া যায় এবং দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো এড়ানো সম্ভব।

কলোসিয়ামের ভেতরে গাইডেড ট্যুরের ব্যবস্থা রয়েছে। উপরের তলায় একটি ছোট জাদুঘরও রয়েছে। এছাড়া প্রতি বছর গুড ফ্রাইডে এখানে পোপের নেতৃত্বে ঐতিহ্যবাহী ওয়ে অব দ্য ক্রস (Via Crucis) মিছিল অনুষ্ঠিত হয়, যা কলোসিয়ামকে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্বে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

admin

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *